ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আমেজ কাটতে না কাটতেই রাজধানীতে শুরু হয়েছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে নতুন রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। নির্বাচন কমিশন এখনও ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করেনি। তবে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা, পোস্টার-ব্যানার এবং দলীয় নেতাকর্মীদের মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতিতে এরই মধ্যে সরব হয়ে উঠেছে দুই সিটির রাজনীতি।
ক্ষমতাসীন বিএনপির কাছে ঢাকার দুই সিটি নির্বাচন কেবল স্থানীয় সরকার নির্বাচন নয়, জাতীয় রাজনীতির ধারাবাহিকতায় এটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষাও হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে দলীয় ভোটের পাশাপাশি সাধারণ ভোটারের কাছে গ্রহণযোগ্যতা, ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, নিজস্ব ভোটব্যাংক, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং নগর পরিচালনার অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে প্রার্থী বাছাই করতে চায় দলটি।
দলীয় সূত্র ও মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ—দুই সিটিতেই একাধিক হেভিওয়েট নেতা সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন।
উত্তরে তাবিথ, কাইয়ুম ও মিল্টন
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন সাবেক প্রার্থী তাবিথ আউয়াল, বর্তমান প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান (মিল্টন) এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা এম এ কাইয়ুম।
গত সিটি নির্বাচনে বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী ছিলেন তাবিথ আউয়াল। ২০২০ সালের ৩০ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আতিকুল ইসলামের কাছে তিনি পরাজিত হন। তাবিথের দাবি, ওই নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপির কারণে তিনি জয়ী হতে পারেননি। এবার দল মনোনয়ন দিলে আধুনিক ও বাসযোগ্য ঢাকা গড়ার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে চান তিনি।
অন্যদিকে উত্তরের প্রার্থী তালিকায় নতুন করে আলোচনায় এসেছেন বর্তমান প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান (মিল্টন)। যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি মিল্টন এর আগে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করায় নগর ব্যবস্থাপনা ও সিটি কর্পোরেশনের কার্যক্রম সম্পর্কে সরাসরি অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পেয়েছেন তিনি।
মিল্টন জানিয়েছেন, দল সুযোগ দিলে তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে প্রস্তুত। তবে দল যাকেই মনোনয়ন দেবে, তার বিজয়ের জন্য কাজ করবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে উত্তরের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার কারণে এম এ কাইয়ুমের নামও জোরালোভাবে আলোচনায় রয়েছে। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ক্ষুদ্রঋণ বিষয়ক সম্পাদক কাইয়ুম ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সভাপতি। স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক যোগাযোগ রয়েছে বলে অনুসারীরা মনে করেন।
তবে প্রার্থিতার বিষয়ে কাইয়ুম দলীয় সিদ্ধান্তকেই চূড়ান্ত বলে জানিয়েছেন। নির্বাচন করার ইচ্ছা থাকলেও দল যাকে মনোনয়ন দেবে, তার পক্ষেই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
দক্ষিণে আলোচনায় ইশরাক, সালাম ও সোহেল
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন, বর্তমান প্রশাসক আব্দুস সালাম এবং বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল।
দক্ষিণে তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন ইশরাক হোসেন—এমনটাই মনে করছেন দলটির স্থানীয় অনেক নেতাকর্মী। ২০২০ সালের সিটি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তিনি ২ লাখ ৩৬ হাজার ৫১২ ভোট পেয়েছিলেন।
দলের স্থানীয় নেতাদের দাবি, ওই নির্বাচনের পর দক্ষিণের বিভিন্ন এলাকায় ইশরাকের একটি নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচিতি ও অনুসারী গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে পুরান ঢাকার সঙ্গে তার পারিবারিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক। তার বাবা প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকা ছিলেন অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও বিএনপির প্রভাবশালী নেতা।
তরুণ নেতৃত্বের চাহিদা, পুরান ঢাকার পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য এবং আগের নির্বাচনের অভিজ্ঞতা—এই তিনটি বিষয় ইশরাকের পক্ষে যেতে পারে বলে মনে করছেন তার অনুসারীরা।
ইশরাক হোসেন জানিয়েছেন, দল চাইলে তিনি সিটি নির্বাচনে অংশ নিতে প্রস্তুত। প্রয়োজনে মন্ত্রিত্ব ছেড়ে নির্বাচনের মাঠে নামতেও প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন তিনি। তার দাবি, নগরকেন্দ্রিক রাজনীতির মধ্য দিয়েই তার রাজনৈতিক পথচলা শুরু এবং আগের নির্বাচনের মাধ্যমে দক্ষিণের বিভিন্ন এলাকায় তার শক্ত সামাজিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
প্রশাসনিক অভিজ্ঞতায় আব্দুস সালাম
ইশরাকের পাশাপাশি দক্ষিণে শক্তিশালী সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান প্রশাসক আব্দুস সালাম। নগর প্রশাসনে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাই তার অন্যতম বড় শক্তি বলে মনে করছেন অনুসারীরা।
এর আগে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ডেপুটি মেয়রের দায়িত্ব পালন করেছেন আব্দুস সালাম। নির্বাচিত কাউন্সিলর ও ওয়ার্ড চেয়ারম্যান হিসেবেও কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। ফলে নগর ব্যবস্থাপনা, নাগরিকসেবা ও স্থানীয় প্রশাসনের বাস্তব কার্যক্রম সম্পর্কে তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে।
ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় তার সমর্থকদের পোস্টার-ব্যানার দেখা যাচ্ছে। আব্দুস সালামও নির্বাচনের প্রস্তুতির কথা জানিয়ে বলেছেন, জনগণ ভোট দিয়ে নির্বাচিত করলে পূর্ণ মেয়াদে আরও পরিকল্পিতভাবে নগরবাসীকে সেবা দিতে চান তিনি।
সাংগঠনিক শক্তিতে সোহেলের অবস্থান
দক্ষিণে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় থাকা আরেক নেতা হাবিব উন নবী খান সোহেল। ছাত্র ও অঙ্গসংগঠনের রাজনীতি পেরিয়ে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা তার অন্যতম শক্তি।
তিনি স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে দলীয় মূলধারা, অঙ্গসংগঠন ও তৃণমূল পর্যায়ে তার বিস্তৃত সাংগঠনিক যোগাযোগ রয়েছে বলে অনুসারীরা মনে করেন।
বিভিন্ন এলাকায় সোহেলের ছবি ও শুভেচ্ছাবার্তা সংবলিত পোস্টার-ব্যানারও দেখা যাচ্ছে। তবে প্রার্থিতার বিষয়ে এখনো দলীয় কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা পাননি বলে জানিয়েছেন তিনি। দল যেভাবে দায়িত্ব দেবে, সেভাবেই কাজ করবেন বলে জানিয়েছেন সোহেল।
প্রার্থী বাছাইয়ে জনপ্রিয়তা নাকি সংগঠন?
দুই সিটির সম্ভাব্য প্রার্থীদের শক্তি বিশ্লেষণে উত্তরে তিনটি আলাদা সমীকরণ সামনে এসেছে। তাবিথ আউয়ালের রয়েছে আগের নির্বাচনের অভিজ্ঞতা, এম এ কাইয়ুমের রয়েছে দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক প্রভাব এবং মিল্টনের রয়েছে নগর প্রশাসনের বর্তমান অভিজ্ঞতা।
দক্ষিণে ইশরাকের পক্ষে রয়েছে তরুণ নেতৃত্ব, পুরান ঢাকার পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও আগের নির্বাচনের অভিজ্ঞতা। বিপরীতে আব্দুস সালামের রয়েছে নগর প্রশাসনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং সোহেলের রয়েছে বিস্তৃত সাংগঠনিক বলয়।
বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের মতে, শুধু দলীয় পরিচয় বা সাংগঠনিক পদ নয়, প্রার্থী বাছাইয়ে সাধারণ ভোটারের কাছে গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনে জয় পাওয়ার সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
বিশেষ করে দক্ষিণে পুরান ঢাকা, নতুন যুক্ত হওয়া ওয়ার্ড এবং মধ্য ঢাকার ভোটারদের রাজনৈতিক মনোভাব ও স্থানীয় অগ্রাধিকার ভিন্ন। ফলে সেখানে প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
একইভাবে উত্তরে গাবতলী, মিরপুর, বাড্ডা, ভাটারা, উত্তরা ও আব্দুল্লাহপুরের মতো বৈচিত্র্যময় এলাকার ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করাও বিএনপির প্রার্থীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
এখনো চূড়ান্ত হয়নি প্রার্থী
দলীয় সূত্র জানিয়েছে, দুই সিটির কোনো প্রার্থীকেই এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত করা হয়নি। নির্বাচন কমিশনের সময়সূচি এবং মাঠের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বিএনপির নীতিনির্ধারণী মহল।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু জানিয়েছেন, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের মনোনয়ন নিয়ে দলীয় হাইকমান্ডে আনুষ্ঠানিক আলোচনা এখনো শেষ হয়নি। দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে।
অন্যদিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, আগে নির্বাচনের সময়সূচি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা হতে হবে। এরপর নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রার্থী নিয়ে আলোচনা হবে। প্রার্থী নির্ধারণ দলের গোপনীয় ও কৌশলগত বিষয় বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।
তৃণমূলে প্রস্তুতি, নজরে কাউন্সিলর প্রার্থীরাও
মেয়র প্রার্থী চূড়ান্ত না হলেও মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক প্রস্তুতি শুরু করেছে বিএনপি। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদারে আটটি বিশেষ টিম গঠন করেছে।
এসব টিম মাঠপর্যায়ে সংগঠনের অবস্থা, নেতাকর্মীদের তৎপরতা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থীদের ব্যক্তিগত আমলনামা, জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক ভূমিকা নিয়েও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মহানগর দক্ষিণের নেতারা।
ফলে জাতীয় নির্বাচনের পর ঢাকার দুই সিটি নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির রাজনীতিতে এখন বড় প্রশ্ন—জনপ্রিয় মুখ, নাকি পরীক্ষিত সংগঠক? সাবেক প্রার্থী, নাকি নতুন মুখ?
শেষ পর্যন্ত কোন সমীকরণে বিএনপির হাইকমান্ড আস্থা রাখে, তার ওপরই নির্ভর করছে ঢাকার দুই সিটিতে মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন কে পাচ্ছেন।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন