দূর থেকে দেখলে মনে হবে ছোট কোনো ঝোপঝাড়ে ঢাকা পরিত্যক্ত বনভূমি। কাছে গেলেই চোখে পড়ে মরিচা ধরা গাড়ির ছাদ, ভাঙা কাচ, খোলা দরজা আর লতাপাতায় ঢেকে যাওয়া ইঞ্জিনের অংশ। কোথাও গাড়ির ভেতর জন্মেছে আগাছা, আবার কোথাও ছাদ ভেদ করে মাথা তুলেছে ছোট ছোট গাছ।
চট্টগ্রাম নগরীর সিআরবি সাত রাস্তার মোড় এলাকায় বাংলাদেশ রেলওয়ের অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান হিসাব অধিকর্তা (পূর্ব) কার্যালয়ের পেছনের একটি খোলা জায়গায় বছরের পর বছর ধরে এভাবেই পড়ে আছে রেলওয়ের একাধিক সরকারি গাড়ি। একসময় দাপ্তরিক কাজে ব্যবহৃত এসব যানবাহন এখন পরিণত হয়েছে মরিচা ধরা ধ্বংসাবশেষে।
সরেজমিনে দেখা যায়, খোলা আকাশের নিচে সারিবদ্ধভাবে পড়ে আছে বিভিন্ন মডেলের জিপ, মাইক্রোবাস, পিকআপ ও সেডান গাড়ি। কোনো গাড়ির চাকা নেই, কোনোটি আবার ভাঙা কাচ ও খোলা দরজা নিয়ে পড়ে আছে। অনেক গাড়ির ইঞ্জিনসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশও খুলে নেওয়া হয়েছে।
বৃষ্টি, রোদ ও দীর্ঘদিনের অযত্নে গাড়িগুলোর ধাতব অংশে ধরেছে মরিচা। কোথাও কোথাও বডি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। লতাপাতা ও ঝোপঝাড়ের আড়ালে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে একসময় সচল থাকা সরকারি যানবাহনগুলো।
স্থানীয়দের ভাষ্য, অন্তত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে গাড়িগুলো একই জায়গায় পড়ে আছে। এমনকি নতুন প্রজন্মের অনেক রেলকর্মী চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগেও এসব গাড়ি সেখানে ছিল বলে জানিয়েছেন তারা।
যন্ত্রাংশও উধাও
রেলওয়ের কয়েকজন কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এসব গাড়ির অনেকগুলো একসময় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক কাজে ব্যবহৃত হতো। মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কিংবা ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ার পর সেগুলো নিলাম বা অপসারণের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
তাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকায় গাড়িগুলোর মূল্যবান বিভিন্ন যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে গেছে। ব্যাটারি, হেডলাইট, মিটার, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও সিটের বিভিন্ন অংশসহ নানা উপকরণ একে একে উধাও হয়েছে।
ফলে যেসব গাড়ি কোনো একসময় সংস্কার করে ব্যবহার করা সম্ভব ছিল, সেগুলোর অনেকগুলোই এখন সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়েছে।
নিলাম না হওয়ায় কমছে সম্পদের মূল্য
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি যানবাহন মেয়াদোত্তীর্ণ বা ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়লে নির্ধারিত নিয়মে সেগুলোর মূল্যায়ন করে নিলাম কিংবা স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রির ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ফেলে রাখার কারণে একদিকে যেমন সরকারি সম্পদের মূল্য কমছে, অন্যদিকে সম্ভাব্য রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেলওয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, অনেক গাড়ি দীর্ঘদিন ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। এগুলো নিষ্পত্তির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তালিকা প্রস্তুত করে পর্যায়ক্রমে নিলামের উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। তবে বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে কাজটি দ্রুত এগোচ্ছে না।
রেলওয়ের এক প্রকৌশলী বলেন, কিছু গাড়ির মেরামত ব্যয় নতুন গাড়ি কেনার খরচের কাছাকাছি চলে গেছে। এ অবস্থায় সেগুলো সচল করা অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক নাও হতে পারে। তবে দীর্ঘদিন খোলা জায়গায় ফেলে রাখাও সমাধান নয়।
নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, সিআরবির মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এভাবে পরিত্যক্ত যানবাহনের স্তূপ শুধু দৃষ্টিকটুই নয়, নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের কারণ। অরক্ষিত এসব স্থানে মাদকসেবীদের আড্ডা কিংবা বিভিন্ন ধরনের অসামাজিক কার্যকলাপের আশঙ্কা রয়েছে বলেও তারা মনে করেন।
বিষয়টি নিয়ে বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বিভাগ দেখবে।
তবে প্রধান প্রকৌশলী (পূর্ব), প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী ও প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রেলওয়ের বিশাল সম্পদভাণ্ডারের একটি ছোট অংশের এই চিত্র সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়া সরকারি সম্পদ সময়মতো নিষ্পত্তি না হলে কীভাবে ধীরে ধীরে মূল্য হারায়, সিআরবিতে পড়ে থাকা এসব পরিত্যক্ত গাড়ি যেন তারই নীরব উদাহরণ।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন