গ্রাহকদের শত কোটি টাকা আত্মসাৎ ও প্রতারণার অভিযোগে দায়ের করা ১২৪টি মামলার আসামি বিশ্বাস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান আনিসকে গ্রেপ্তার করেছে কুষ্টিয়ার কুমারখালী থানা পুলিশ। একাধিক মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আনিস এর আগে কারাগার থেকে পালিয়েছিলেন।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাত ১২টার দিকে ঢাকার বিমানবন্দর থানা এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। কুমারখালী থানা পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তি ও র্যাবের সহায়তায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামাল উদ্দিন জানান, মানুষকে দ্বিগুণ লাভের প্রলোভন দেখিয়ে আনিসুর রহমান বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মামলার পর তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট তিনি কারাগার থেকে পালিয়ে যান। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাকে আবারও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
১২৪ মামলা, একাধিক মামলায় সাজা
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শুরুতে কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন আদালতে আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার অভিযোগে ১২৪টি মামলা হয়। এর মধ্যে ১২টি মামলায় বিভিন্ন মেয়াদে তার সাজা হয়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল বিদেশে পালানোর সময় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে কুমারখালী থানা পুলিশ। পরে তাকে কুষ্টিয়া কারাগারে পাঠানো হয়।
তবে ওই বছরের ৭ আগস্ট কারাগারের প্রধান ফটক ভেঙে আনিসুর রহমানসহ ১০৪ জন আসামি পালিয়ে যান বলে জানিয়েছে পুলিশ।
দ্বিগুণ লাভের প্রলোভনে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ
আনিসুর রহমান কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার নন্দলালপুর ইউনিয়নের সদরপুর গ্রামের মৃত ইব্রাহিম বিশ্বাসের ছেলে। ২০০৬ সালে কুমারখালীর আলাউদ্দিন নগর এলাকায় ‘বিশ্বাস সঞ্চয় ঋণদান ও সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান চালু করেন তিনি।
পুলিশ, এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী, পাবনা, ঝিনাইদহসহ বিভিন্ন জেলায় প্রতিষ্ঠানটির শাখা বিস্তৃত করা হয়। দ্বিগুণ টাকা ফেরত দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন মেয়াদি ডিপিএসের নামে গ্রাহকদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, একপর্যায়ে বিপুল অর্থ জমা হলে সেই অর্থ দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে জমি, বাড়ি ও গাড়িসহ বিভিন্ন সম্পদ গড়ে তোলা হয়।
২০২৩ সালের নভেম্বরে গ্রাহকেরা জমা টাকা ফেরতের জন্য চাপ দিলে আনিসুর রহমান অফিসে তালা ঝুলিয়ে আত্মগোপনে চলে যান বলে অভিযোগ রয়েছে।
৫৮ শাখায় শত কোটি টাকা বিনিয়োগের অভিযোগ
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের নয়টি জেলায় বিভিন্ন নামে বিশ্বাস ফাউন্ডেশনের আওতায় ৫৮টি শাখা পরিচালিত হতো। এসব শাখায় প্রায় ১৫৩ জন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার কথা বলে কর্মীদের কাছ থেকে একাধিক ফাঁকা চেক ও স্ট্যাম্প নেওয়া হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে। পরে কর্মীদের মাধ্যমে তাঁদের আত্মীয়-স্বজনকে বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা ও লাভের প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হয় বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন।
টাকা ফেরতের দাবি ভুক্তভোগীদের
গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বৃহস্পতিবার সকাল থেকে কুমারখালী থানায় ভুক্তভোগীদের ভিড় দেখা যায়। পুলিশ তাদের আদালতে মামলা করার পরামর্শ দিয়েছে।
রাজবাড়ীর পাংশার আব্দুল মাজেদ (৬৪) জানান, সারা জীবন গার্মেন্টসে চাকরি করে দেড় লাখ টাকা জমিয়েছিলেন। চার বছরে দ্বিগুণ লাভের আশায় সেই টাকা আনিসুর রহমানের প্রতিষ্ঠানে জমা রাখেন। কিন্তু টাকা ফেরত না দিয়ে আনিসুর পালিয়ে যান বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আনিসুর রহমানের ভাগনে বিনা খাতুনও জানান, দ্বিগুণ লাভের আশায় তিনি তিন লাখ টাকা জমা রেখেছিলেন। এখন সেই টাকা হারিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন