সাভারের প্রীতি গ্রুপের গার্মেন্টসে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের সময় সপ্তম তলায় কাজ করছিলেন প্রায় ৩২০ শ্রমিক। হঠাৎ বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো কারখানা। প্রথমে অনেকেই ঘটনাটিকে বজ্রপাত মনে করেছিলেন। কিন্তু বাইরে বের হয়ে চারদিকে আগুন দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন শ্রমিকরা।
ঘটনার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে কারখানার শ্রমিক মো. শামীম বলেন, ‘হঠাৎ বিকট এক শব্দ শুনতে পাই। ভেবেছিলাম বাইরে হয়তো বজ্রপাত পড়েছে। সবাই ছোটাছুটি করে বের হওয়ার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু বাইরে এসে দেখি ভিন্ন রূপ—চারদিকে শুধু আগুন আর আগুন।’
প্রায় ১১ বছর ধরে প্রীতি গ্রুপে কাজ করা শামীম জানান, সোমবার সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে তারা সপ্তম তলায় কাজ করছিলেন। বিকট শব্দের পরপরই বিদ্যুৎ চলে যায়। অন্ধকারের মধ্যে ফ্লোর থেকে বের হওয়ার সময় শ্রমিকদের মধ্যে হুড়োহুড়ি শুরু হলে অনেকেই আহত হন।
শামীমের দাবি, কারখানাটিতে প্রায় ৬ থেকে ৭ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। অথচ কারখানার বাইরে খোলা পিকআপ ভ্যানে গ্যাস সিলিন্ডার ফেলে রাখা হয়েছিল, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
হতাহতের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘শুনেছি ৭ থেকে ৮ জন মারা গেছেন এবং আরও ২৫ জনের মতো আহত হয়েছেন।’ তবে এ সংখ্যা তিনি নিজে নিশ্চিত করেননি। তাঁর ভাষ্য, বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে প্রায় আধা কিলোমিটার দূর পর্যন্ত গ্যাস সিলিন্ডার উড়ে যায় এবং সেখানেও কয়েকজন আহত হন।
শামীম বলেন, এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কারখানা পরিচালনা শ্রমিকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে। শ্রমিকদের জীবন রক্ষায় নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত পাশের বাড়ি
প্রীতি গ্রুপের ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ ফুট দূরে রাস্তার পশ্চিম পাশে রয়েছে তিনতলা ভবন ‘খান মঞ্জিল’। বিস্ফোরণের সময় ওই ভবনে ছিলেন ৪৫ বছর বয়সী আরিফা বেগম।
তিনি জানান, ঘটনার সময় নিজের কক্ষে বসে ছিলেন। হঠাৎ বিকট শব্দে বারান্দার দরজা খুলে যায়। বাইরে তাকিয়ে দেখতে পান ভয়াবহ আগুন। বিস্ফোরণের তীব্রতায় গ্যাস সিলিন্ডারের বিভিন্ন অংশ আকাশে উড়ে যেতে দেখেন তিনি।
আরিফা বেগমের ভাষ্য, আগুনের সূত্রপাত পাশের প্রীতি গ্রুপের গার্মেন্টসে। এর কাছেই রয়েছে ‘এফএনএফ’ নামে আরেকটি গার্মেন্টস। বিস্ফোরণের পর উড়ে আসা একটি গ্যাস সিলিন্ডারের অংশ তাদের বাড়ির তৃতীয় তলার ছাদে আঘাত করে। এতে ছাদের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিস্ফোরণের তীব্রতায় ভবনটির জানালার কাচ ভেঙে যায়। ছাদের একাংশ ধসে পড়ায় পানির ট্যাংক ও পাইপলাইন নষ্ট হয়েছে। ছাদে থাকা গাছপালা ও ঘরের আসবাবপত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানান তিনি।
গ্যাস সিলিন্ডারের আঘাতে আহত
ঘটনার পর স্বামীকে ফোন করলে তিনি আরিফাকে দ্রুত নিচে নেমে আসতে বলেন। আতঙ্কে প্রথমে ছাদে গেলেও পরে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার সময় উড়ে আসা গ্যাস সিলিন্ডারের একটি অংশ তাঁর পায়ে আঘাত করে।
এতে তাঁর পা কেটে যায়। তীব্র ব্যথার কারণে এখনো হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে বলে জানান তিনি।
আরিফা বলেন, বিস্ফোরণের সময় ভবনটিতে কয়েকজন ভাড়াটিয়াও ছিলেন। তবে তাঁর সন্তান মাদ্রাসায় থাকায় সে নিরাপদে ছিল।
ঘটনার প্রকৃত কারণ, বিস্ফোরণে ব্যবহৃত গ্যাস সিলিন্ডারের সংখ্যা এবং হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের অপেক্ষা করছে স্থানীয়রা।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন