২০১৯ সালের ভয়াবহ ইস্টার সানডে বোমা হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে ১৫ জনকে সন্ত্রাসবাদের বিভিন্ন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করেছেন শ্রীলঙ্কার একটি হাইকোর্ট। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) তিন বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ রায় ঘোষণা করেন। দোষী সাব্যস্ত প্রত্যেক আসামিকে ২০০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রায়ের শুরুতে মোট দণ্ডসীমা অন্তত ২২০ বছর উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশও দিয়েছেন আদালত।
রায় ঘোষণার সময় আদালত প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলা এই বিচারপ্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে আসছিলেন।
আদালতে দোষী সাব্যস্ত ১৫ আসামির বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু খ্রিস্টান সম্প্রদায় ও বিদেশি পর্যটকদের লক্ষ্য করে পরিকল্পিত বোমা হামলায় ষড়যন্ত্র ও সহায়তার অভিযোগ আনা হয়েছিল। শ্রীলঙ্কাভিত্তিক দুটি ইসলামপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামলার পরিকল্পনা করেছিল বলে তদন্তে ধারণা করা হয়।
২০২১ সালে হামলার পরিকল্পনা বা এতে প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে ২৫ সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে ২৩ হাজার ২৭০টি অভিযোগ আনা হয়েছিল। এসব অভিযোগের মধ্যে হত্যা, সন্ত্রাসবাদের ষড়যন্ত্র এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আগ্নেয়াস্ত্র ও বিস্ফোরক-সংক্রান্ত অপরাধও ছিল। গির্জা, পর্যটক হোটেল ও অন্যান্য স্থানে চালানো একাধিক হামলার ঘটনাকে এসব অভিযোগের আওতায় আনা হয়।
মামলায় আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় নয়জন আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে। বিচার শুরুর আগেই একজন আসামির মৃত্যু হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের নেতৃত্ব দেওয়া হারিপ্রিয়া জয়াসুন্দরারা আসামিদের আরও দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, খ্রিস্টান উপাসনাকারী ও পর্যটকদের হত্যার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত হামলায় আসামিরা অংশ নিয়েছিলেন। আত্মঘাতী বোমারুদের একজনের রেখে যাওয়া ভিডিওকে এ দাবির পক্ষে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
হামলার আগের দিন ধারণ করা ওই ভিডিওতে মুখ ঢাকা কয়েকজন হামলাকারীকে রাইফেল ও তলোয়ার হাতে দেখা যায়। তারা তৎকালীন ইসলামিক স্টেট (আইএস) নেতা আবু বকর আল-বাগদাদির প্রতি আনুগত্যের শপথ নেয় এবং শ্রীলঙ্কাকে ইসলামি রাষ্ট্রে পরিণত করার পাশাপাশি যুদ্ধ চালানোর কথা বলে।
রায়ের পর ক্যাথলিক ধর্মযাজক জুড ফার্নান্দো বলেন, শেষ পর্যন্ত বিচার পাওয়া গেছে। তবে এই পর্যায়ে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লেগেছে।
তবে মামলার রায় হলেও শ্রীলঙ্কার ক্যাথলিক চার্চের দীর্ঘদিনের প্রশ্নের পুরোপুরি অবসান হয়নি। চার্চের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে দাবি করা হচ্ছে, বিচারাধীন ব্যক্তিরা হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন না এবং এর পেছনে আরও বড় ধরনের রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্র থাকতে পারে।
এদিকে একটি সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, হামলার আগে একাধিক গোয়েন্দা সতর্কবার্তা পাওয়ার পরও পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।
২০১৯ সালের ২১ এপ্রিল ইস্টার সানডের প্রার্থনার সময় গির্জা এবং কয়েকটি বিলাসবহুল হোটেলে ধারাবাহিক আত্মঘাতী বোমা হামলা চালানো হয়। হামলায় ২৬৭ জন নিহত এবং প্রায় ৬ হাজার মানুষ আহত হন। ইসলামিক স্টেটের মতাদর্শে অনুপ্রাণিত এই হামলাগুলো শ্রীলঙ্কার ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে বিবেচিত। হামলায় অংশ নেওয়া নয়জন আত্মঘাতী বোমারু বিস্ফোরণে নিহত হওয়ায় সরাসরি হামলাকারীদের কেউ জীবিত নেই।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন