স্পট মার্কেটে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম দ্রুত বাড়ায় চাপে পড়েছে এশিয়ার জ্বালানি বাজার। উচ্চমূল্যের কারণে চীনসহ এশিয়ার কয়েকটি দেশ এলএনজি আমদানি কমালেও শীতের আগে মজুত নিশ্চিত করতে ইউরোপীয় দেশগুলো তুলনামূলক বেশি দামেও গ্যাস কিনছে। এতে সীমিত সরবরাহের বাজারে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে এলএনজি নিয়ে প্রতিযোগিতা আরও বেড়েছে।
পণ্যবাজার বিশ্লেষক সংস্থা কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, চলতি সেপ্টেম্বরে এশিয়ায় এলএনজি আমদানি প্রায় ২০ দশমিক ০৯ মিলিয়ন টনে নেমে আসতে পারে। গত বছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ২২ দশমিক ২৭ মিলিয়ন টন এবং চলতি বছরের আগস্টে ছিল ২২ দশমিক ২৫ মিলিয়ন টন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে যেমন আমদানি কমেছে, তেমনি এক মাসের ব্যবধানেও তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সেপ্টেম্বরের এই পরিমাণ ২০১৮ সালের পর একই মাসে সর্বনিম্ন হতে পারে।
অন্যদিকে শীত মৌসুমের আগে গ্যাসের মজুত বাড়াতে ইউরোপে এলএনজি আমদানি বাড়ছে। কেপলারের হিসাবে, সেপ্টেম্বরে ইউরোপে এলএনজি আমদানি প্রায় ৭ দশমিক ৯৮ মিলিয়ন টনে পৌঁছাতে পারে। অক্টোবর মাসে তা বেড়ে ১০ দশমিক ৫৩ মিলিয়ন টনে উঠতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের গ্যাস মজুতও বছরের এই সময়ের পাঁচ বছরের গড়ের তুলনায় প্রায় ১৬ শতাংশ পয়েন্ট কম থাকায় আমদানির চাপ বাড়ছে।
বাজারে সরবরাহ সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে হরমুজ প্রণালির চলমান অস্থিরতা এবং কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্নকে। কাতার বিশ্বের অন্যতম প্রধান এলএনজি সরবরাহকারী। দেশটির রপ্তানি অবকাঠামোয় ক্ষয়ক্ষতি এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্নের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ কমেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর এশিয়ায় এলএনজির স্পটমূল্য ফেব্রুয়ারির তুলনায় প্রায় ১৫০ শতাংশ বেড়ে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে প্রায় ২৬ ডলারে উঠেছে। উচ্চমূল্যের কারণে এশিয়ার কিছু ক্রেতা স্পট মার্কেট থেকে কেনাকাটা কমিয়ে দিচ্ছেন।
ইউরোপের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে রাশিয়ার পাইপলাইন গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ার পর। ফলে শীতের আগে মজুত বাড়াতে ইউরোপীয় ক্রেতাদের বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এশিয়ার কিছু বাজার উচ্চমূল্যের কারণে পিছু হটার ফলে কিছু এলএনজি কার্গো ইউরোপের দিকে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের পরও ইউরোপ বিপুল পরিমাণ এলএনজি আমদানি করেছিল। তবে এবার পরিস্থিতির পার্থক্য হলো, রাশিয়ার পাইপলাইন গ্যাসের আগের মতো সরবরাহ না থাকায় ইউরোপের বিকল্প উৎসের ওপর নির্ভরতা আরও বেড়েছে।
চীন অবশ্য তুলনামূলকভাবে ভিন্ন কৌশল নিয়েছে। স্পট মার্কেটের উচ্চমূল্য এড়িয়ে দেশটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে এলএনজি সংগ্রহ করছে এবং রাশিয়া থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আমদানি অব্যাহত রেখেছে। অন্যদিকে উচ্চমূল্যের এলএনজি কেনা কঠিন হয়ে পড়ায় এশিয়ার কিছু উন্নয়নশীল দেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লাসহ তুলনামূলক সস্তা জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে।
বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্যও এই পরিস্থিতি বাড়তি চাপ তৈরি করছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশসহ এশিয়ার কয়েকটি দেশ এলএনজি সরবরাহের উৎস ও পরিবহনপথে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কাতারনির্ভরতার পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও চীনের মতো উৎস থেকেও সরবরাহের সম্ভাবনা খোঁজা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, এশিয়ায় উচ্চমূল্যের কারণে এলএনজি চাহিদা কিছুটা কমলেও ইউরোপের শীতকালীন মজুত বাড়ানোর চাপ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি এবং কাতারের এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগে, তার ওপর আগামী মাসগুলোতে বৈশ্বিক এলএনজি বাজারের দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন