মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ১৪ দলীয় জোটের শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে তিনটি অভিযোগে ১০ বছর করে মোট ৩০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়েছে।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ বিষয়টি জানিয়েছেন। প্রায় ৫০০ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
এর আগে গত ৫ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে তিনটি অভিযোগে ইনুকে ১০ বছর করে মোট ৩০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায় ঘোষণার কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছিল।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। আসামিপক্ষে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী।
মামলায় হাসানুল হক ইনুই একমাত্র আসামি। তার বিরুদ্ধে দাখিল করা অভিযোগপত্র ছিল ৩৯ পৃষ্ঠার। এর সঙ্গে এক হাজার ৬৭৯ পৃষ্ঠার নথিপত্র, তিনটি অডিও ও ছয়টি ভিডিও ডকুমেন্ট সংযুক্ত ছিল।
যেসব অভিযোগ আনা হয়
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে কোটা সংস্কার ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে ইনুর বিরুদ্ধে উসকানি, প্ররোচনা, নির্দেশনা ও সহায়তার অভিযোগ আনা হয়।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ ছিল, আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী, জঙ্গি ও সাম্প্রদায়িক হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগে উসকানি দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ১৪ দলীয় জোট সরকারের অংশীদার হিসেবে জাসদ সভাপতি ইনু তার অবস্থান থেকে আন্দোলন দমনে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে নির্দেশনা, প্ররোচনা ও সহায়তা করেন বলে অভিযোগ করা হয়।
বিদেশি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার
অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই একটি বিদেশি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইনু আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক হিসেবে উল্লেখ করেন। প্রসিকিউশনের দাবি, আন্দোলন দমন এবং আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার উদ্দেশ্যে এসব বক্তব্যের মাধ্যমে বলপ্রয়োগে উসকানি দেওয়া হয়েছিল।
এ ছাড়া ২৭ জুলাই একটি টেলিভিশন চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও তিনি আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী, জঙ্গি ও সাম্প্রদায়িক হিসেবে আখ্যায়িত করে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।
১৪ দলের বৈঠকে অংশগ্রহণের অভিযোগ
অভিযোগপত্রে বলা হয়, ১৯ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গণভবনে অনুষ্ঠিত ১৪ দলীয় জোটের সভায় হাসানুল হক ইনু উপস্থিত ছিলেন। ওই সভায় কোটা সংস্কার ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া, দেশব্যাপী সেনা মোতায়েন ও কারফিউ জারির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ, এসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে ইনু নির্দেশনা, প্ররোচনা, উসকানি ও সহায়তা করেছিলেন।
২৯ জুলাই শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আরেকটি ১৪ দলীয় জোটের সভায় ইনু উপস্থিত ছিলেন বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়। সেখানে আন্দোলন দমন এবং আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হয় বলে প্রসিকিউশনের অভিযোগ।
কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন করার অভিযোগ
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০ জুলাই দুপুরে ইনু তার নিজ জেলা কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন করে আন্দোলনকারীদের ছবি দেখে তালিকা তৈরি এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
প্রসিকিউশনের দাবি, ওই নির্দেশের পর কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের সদস্য এবং আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র কর্মীরা ৫ আগস্ট পর্যন্ত কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালায়।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, এ ঘটনায় শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন ও মো. উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী এবং চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ নিহত হন। রাইসুল হকসহ আরও অনেকে আহত এবং অনেকে আটক ও নির্যাতনের শিকার হন বলে অভিযোগ করা হয়।
শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, ইনু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার, আন্দোলনকারীদের ঘেরাও, হেলিকপ্টার ব্যবহার করে হামলা, গুলি, বোমা হামলা, আটক ও নির্যাতনের পরিকল্পনা ও উসকানিতে সম্পৃক্ত ছিলেন।
৪ আগস্ট কারফিউ বহাল রাখা এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে গুলি চালানোর মতো পদক্ষেপে শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তকে ইনু অনুমোদন করেন এবং তা বাস্তবায়নে টেলিফোনে যোগাযোগের মাধ্যমে সহায়তা করেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
কুষ্টিয়ায় ছয়জন নিহতের অভিযোগ
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কুষ্টিয়ায় হাজারো মানুষ রাস্তায় নামে। সকাল ১০টার দিকে হাসপাতাল মোড়ে জড়ো হয়ে তারা চৌড়হাস হয়ে মজমপুরের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেন।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ, ওই সময় স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও তাদের অঙ্গসংগঠনের কর্মীরা পুলিশের ছত্রচ্ছায়ায় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশের সঙ্গে একত্রে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালায়।
অভিযোগে বলা হয়, দুপুর দেড়টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে পৃথক স্থানে গুলিতে শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, মো. উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ নিহত হন।
মামলার অভিযোগে এসব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী ও পুলিশের ভূমিকার পাশাপাশি হাসানুল হক ইনুর নির্দেশনা, পরিকল্পনা, সহায়তা ও সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়।
৩০ বছরের সাজা
মামলার অভিযোগ ও সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা শেষে গত ৫ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ হাসানুল হক ইনুকে তিনটি অভিযোগে ১০ বছর করে মোট ৩০ বছরের কারাদণ্ড দেন। রোববার ওই রায়ের প্রায় ৫০০ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়েছে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন