শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় নদী-ঝরনা ও পাহাড় কেটে অবাধে পাথর ও বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র প্রকাশ্যে দিনের বেলায় পাহাড়, নদী ও ঝরনা থেকে পাথর-বালু উত্তোলন করে রাতের আঁধারে বিভিন্ন যানবাহনে করে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলনের কারণে গারো পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকা ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়েছে। এতে একদিকে সরকারি সম্পদ লুট হচ্ছে, অন্যদিকে পাহাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত ঝিনাইগাতীর গারো পাহাড়। এই সৌন্দর্যকে ঘিরে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ১৯৯৩ সালে গারো পাহাড়ের গজনীতে গড়ে তোলা হয় একটি বিনোদনকেন্দ্র। মৌজার নাম অনুসারে এর নাম দেওয়া হয় ‘গজনী অবকাশ বিনোদন কেন্দ্র’। গারো পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক এখানে আসেন। এ পর্যটনকেন্দ্র থেকে প্রতিবছর সরকার লাখ লাখ টাকা রাজস্ব পেয়ে থাকে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার কাংশা ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী কালঘোষা নদীর গান্ধিগাঁও, দরবেশতলা, হালচাটি, মালিটিলা, বাকাকুড়া, গজনী ও ছোট গজনীসহ বিভিন্ন এলাকায় এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চলে পাথর ও বালু উত্তোলন চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শতাধিক শ্রমিক বেলচা, কোদালসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহার করে পাহাড় কেটে এবং নদী-ঝরনা থেকে পাথর ও বালু সংগ্রহ করছেন বলে স্থানীয়দের দাবি।
উত্তোলন করা পাথর ও বালু টুকরিতে করে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে স্তূপ করে রাখা হয়। পরে রাত ১২টার পর থেকে ঘোড়ার গাড়ি, ভ্যান, ট্রলি, মাহিন্দ্র ও ট্রাকযোগে এসব পাথর-বালু উপজেলা ও জেলা সদরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
তাদের অভিযোগ, প্রতিদিন রাত ১২টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত পাথর ও বালু উত্তোলন ও পরিবহনের কার্যক্রম চলে। এতে প্রতিরাতে লাখ লাখ টাকা মূল্যের পাথর-বালু সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এভাবে পাথর ও বালু উত্তোলনের ফলে পাহাড়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি নদী-ঝরনার স্বাভাবিক প্রবাহও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে অবাধে পাথর ও বালু উত্তোলন চললেও তা পুরোপুরি বন্ধ করতে পারছে না প্রশাসন। তবে উপজেলা প্রশাসন বিভিন্ন সময়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে বালুবাহী যানবাহন আটক, জরিমানা এবং জড়িতদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছে। এরপরও পাথর ও বালু উত্তোলন বন্ধ হয়নি বলে দাবি স্থানীয়দের।
গত ৩ জুন রাতে বালুভর্তি চারটি মাহিন্দ্র গাড়ি আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বন বিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়দের দাবি, ওই ঘটনায় এক বন কর্মকর্তা ও বনপ্রহরী জিয়াউর রহমানের ওপর হামলা করা হলে তারা গুরুতর আহত হন। এরপর থেকে বালু উত্তোলনকারীদের প্রতিরোধে বন বিভাগকে বেগ পেতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে বন বিভাগের বক্তব্য, নদীর বালু জেলা প্রশাসনের আওতাধীন। তাই নদী থেকে বালু উত্তোলন বন্ধের দায়িত্ব বন বিভাগের নয়।
এ বিষয়ে রাংটিয়া ফরেস্ট রেঞ্জের ভারপ্রাপ্ত রেঞ্জ কর্মকর্তা ও সহকারী বন সংরক্ষক এসবি তানভীর আহমেদ ইমন বলেন, কেউ বালুভর্তি গাড়ি পাচারের সময় তথ্য দিলে তা আটক করা হবে।
অন্যদিকে, উপজেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে নীরব ভূমিকা পালনের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। এ বিষয়ে ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল আমীনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো বক্তব্য দেননি।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, গারো পাহাড়ের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি পাথর ও বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে প্রাকৃতিক সম্পদ লুট বন্ধে প্রশাসনের নজরদারি আরও জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন