কখনো সকালে বৃষ্টি, আবার দুপুরেই তীব্র গরম। কখনো টানা বর্ষণে নগর থেকে হাওর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে ডুবে যাচ্ছে, আবার বৃষ্টিহীন সময়ে কাঠফাটা রোদে পুড়ছে একই জনপদ। প্রকৃতিকন্যা খ্যাত সিলেটের আবহাওয়ায় যেন গ্রীষ্ম ও বর্ষার চিরচেনা ছন্দ হারিয়ে যাচ্ছে। আবহাওয়ার এমন অস্থিরতায় বাড়ছে জনজীবনের অস্বস্তি।
আবহাওয়ার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত দুই দশকে সিলেটে গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একই সময়ে বেড়েছে বৃষ্টিপাতের পরিমাণও। তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের এমন অস্বাভাবিক পরিবর্তনে বদলে যাচ্ছে সিলেটের প্রকৃতি ও পরিবেশ, হুমকিতে পড়ছে জীববৈচিত্র্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপমাত্রার চরম ওঠানামার কারণে সিলেট শহর অনেকটা ‘হিট আইল্যান্ডে’ পরিণত হয়েছে।
সিলেট আবহাওয়া অফিসের রেকর্ড অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে শহরের গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৩ দশমিক ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অন্যদিকে, ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৮ দশমিক ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। দুই সময়কালের তুলনায় দুই দশকের ব্যবধানে সিলেটের গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
২০২২ সালে এ সময়ে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৮ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়। ২০২৫ সালে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ৩৭ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
শুধু তাপমাত্রা নয়, একই সময়ে সিলেটে বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণও বেড়েছে প্রায় ২১ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বছরে গড় বৃষ্টিপাত ছিল ৩ হাজার ৮০৮ মিলিমিটার। ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এই গড় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৬২৭ মিলিমিটারে।
এ সময়ে ২০২৪ সালে সর্বোচ্চ ৬ হাজার ১৮৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। ২০২৩ সালে ৫ হাজার ৩৩৭ এবং ২০২৫ সালে ৫ হাজার ৩৩৬ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সিলেট আবহাওয়া অফিস ২ হাজার ৮৭৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে।
শুধু বর্ষা মৌসুমেই নয়, প্রাক-বর্ষা মৌসুমেও বৃষ্টিপাত উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০০১ থেকে ২০০৫ সালে মার্চ থেকে মে পর্যন্ত গড় বৃষ্টিপাত ছিল ১ হাজার ৭২০ মিলিমিটার। ২০২০ থেকে ২০২৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৯৫৭ মিলিমিটারে।
সিলেট আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ শাহ মো. সজিব হোসাইন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বাড়ছে। সিলেটও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে সিলেটে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে বেশি গরম অনুভূত হওয়ার কারণ বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি থাকা।
নগরায়ণকে তাপমাত্রা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম। তিনি বলেন, জলাভূমি ও গাছপালা সূর্যের তাপ কিছুটা শোষণ করে নেয়। কিন্তু জলাভূমি ধ্বংস ও গাছপালা কেটে ফেলায় সেই তাপ সরাসরি পরিবেশে ফিরে যাচ্ছে। এতে বায়ু আরও উষ্ণ হয়ে উঠছে।
তার মতে, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন শহর ‘হিট আইল্যান্ডে’ পরিণত হয়েছে। নগরে উঁচু ভবনের সংখ্যা বৃদ্ধি, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার এবং এসব যন্ত্রের বাইরের ইউনিট থেকে নির্গত তাপও পরিবেশকে আরও উষ্ণ করছে।
মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকেও আবহাওয়ার পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন ড. আনোয়ারুল ইসলাম। তিনি বলেন, গত ৩০ বছরে সিলেটের হাওর এলাকায় ভূমি ব্যবহারে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। হাওর রক্ষা বাঁধ, সড়ক ও সেতু নির্মাণ, নির্বিচারে গাছ কাটা এবং হাউজবোটের ব্যবহার হাওরের পরিবেশ ও প্রতিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সিলেটে বৃষ্টিপাত বৃদ্ধির পেছনে উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ুর ভূমিকা রয়েছে বলেও জানান তিনি। বঙ্গোপসাগর থেকে এই বায়ু বিপুল পরিমাণ জলীয় বাষ্প বহন করে আনে। পরে মেঘালয়ের পাদদেশে ওই জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে বৃষ্টিপাত সৃষ্টি করে।
ড. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, মৌসুমি বায়ুর আগমনের সময় সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতার ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে। মার্চ-এপ্রিল মাসে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে বিপুল পরিমাণ জলীয় বাষ্প তৈরি হয়। সেই জলীয় বাষ্প বাতাসের মাধ্যমে সিলেট অঞ্চলে এসে বৃষ্টিপাত ঘটায়। মৌসুমি বায়ু অপেক্ষাকৃত আগে চলে আসার কারণে সিলেটে আগাম বৃষ্টিপাতের প্রবণতাও বাড়ছে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন