শিক্ষকতা কেবল কোনো সাধারণ চাকরি নয়, এটি একটি মহান ব্রত—কথাটি নতুন করে প্রমাণ করেছেন সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি পাল।
প্রাতিষ্ঠানিক মেধা, উদ্ভাবনী পাঠদান পদ্ধতি এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি মানবিক আচরণের মাধ্যমে তিনি যেমন শিশুদের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছেন, তেমনি সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েও অদম্য সাহসে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
গতানুগতিক পাঠদানের বাইরে গিয়ে কোমলমতি শিশুদের আনন্দের মাধ্যমে শেখাতে নানা ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন বিউটি পাল। তার ফেসবুক আইডিতে শিক্ষার্থীদের শরীরচর্চা, নাচ-গান ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে গণিতের বিভিন্ন চিহ্ন ও জটিল বিষয় শেখানোর ভিডিও দেখা যায়।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে বৃক্ষরোপণ, গাছের চারা বিতরণ, জন্মদিনে কেক কেটে আনন্দ উদযাপন এবং নিজ হাতে উপহার দেওয়ার মতো মানবিক কর্মকাণ্ডেও তাকে দেখা গেছে। তার এসব ছোট ছোট উদ্যোগ গ্রামীণ অবকাঠামোর একটি বিদ্যালয়ে তৈরি করেছে উৎসবমুখর পরিবেশ। পাঠ্যবইয়ের মধ্যে শিক্ষাকে সীমাবদ্ধ না রেখে আনন্দের মাধ্যমে শিশুদের শেখানোই তার মূল লক্ষ্য।
বিউটি পাল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ২০০৪-০৫ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ এই শিক্ষিকা চাইলে করপোরেট খাত কিংবা অন্য কোনো উচ্চপদস্থ পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে পারতেন। কিন্তু শহুরে জীবনের সুযোগ-সুবিধার পরিবর্তে তিনি বেছে নেন গ্রামীণ প্রাথমিক শিক্ষাকে।
দীর্ঘদিনের একনিষ্ঠতা ও শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালে তিনি সিলেট জেলা পর্যায়ে ‘শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষিকা’ হিসেবে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদকের জন্য নির্বাচিত হন।
সম্প্রতি বর্ষার দিনে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শাড়ি পরে ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’ গানটির সঙ্গে একটি রিল ভিডিও তৈরি করে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করেন বিউটি পাল।
ভিডিওটি প্রকাশের পর স্থানীয় একটি চক্র ও কিছু নেটিজেন তার পোশাক ও ব্যক্তিগত পছন্দ নিয়ে নেতিবাচক ও মানহানিকর মন্তব্য শুরু করেন। একপর্যায়ে তিনি অনলাইন হয়রানি ও মানসিকভাবে হেনস্তার শিকার হন। অপপ্রচারের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ হিসেবে তিনি ফেঞ্চুগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
বিউটি পালকে সাইবার বুলিংয়ের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দেশের শিক্ষক সমাজ, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অনেকেই তার পাশে দাঁড়ান। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষকরা একই গানের সঙ্গে রিল ভিডিও তৈরি করে এবং লেখালেখির মাধ্যমে প্রতিবাদ জানান।
তার সহপাঠী ও বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা মো. বদরুজ্জামান বাপ্পিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্রামীণ বিদ্যালয়ের এই শিক্ষিকার যোগ্যতা, ত্যাগ ও মেধার কথা তুলে ধরে সংহতি জানান।
গানটির মূল গায়ক মেসবাহ রহমান এবং সংগীতশিল্পী আসিফ আকবরও বিউটি পালের পাশে দাঁড়ান। এ ছাড়া মিজানুর রহমান গ্রামসিসহ বিভিন্ন কনটেন্ট ক্রিয়েটরও বিউটি পালের উদ্যোগের প্রশংসা করেন।
দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সমর্থন ও ভালোবাসার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন বিউটি পাল। মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি তার পাশে দাঁড়ানো সরকারি প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং বুদ্ধিজীবীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
তিনি বলেন, গান, কবিতা, লেখা ও বিভিন্ন সৃজনশীল মাধ্যমের মাধ্যমে যে প্রতিবাদ, সংহতি ও নৈতিক সমর্থন পেয়েছেন, তা তাকে সাহস ও প্রেরণা দিয়েছে।
একই সঙ্গে ভবিষ্যতে কোনো শিক্ষক যেন সাইবার বুলিং, মানহানি কিংবা অনলাইন হয়রানির শিকার না হন, সে জন্য দ্রুত ‘শিক্ষক সুরক্ষা আইন ২০২৬’ প্রণয়নের আবেদন জানান তিনি।
বিউটি পালের গল্প শুধু একজন শিক্ষিকার সাফল্যের গল্প নয়; এটি প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের দায়িত্ব ও আদর্শে অটল থাকার গল্প। শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা, উদ্ভাবনী পাঠদান এবং মানবিক উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন—শিক্ষা শুধু বই ও শ্রেণিকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
নানা প্রতিকূলতা ও কটূক্তিকে পেছনে ফেলে বিউটি পাল আজ অনেকের কাছে একজন অনুপ্রেরণাদায়ী শিক্ষক। সমাজ পরিবর্তনের জন্য বড় কোনো ভাষণের চেয়ে এমন শিক্ষকদের প্রতিদিনের কাজই যে বেশি শক্তিশালী—তার উদাহরণ হয়ে উঠেছেন তিনি।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন