চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের কারণে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত মুদ্রানীতি কমিটির (এমপিসি) ১৪তম সভায় দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি পর্যালোচনা করে এ পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়।
বৈঠকের কার্যবিবরণী নিয়ে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি নিম্নমুখী ধারায় থাকলেও তা ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকারের নির্ধারিত ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এখনও বেশি।
মুদ্রানীতি কমিটি তাদের পর্যালোচনায় বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে বলেছে, পশ্চিম এশিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম এখনও বেশ অস্থিতিশীল। এর মধ্যেই সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপ মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সরকার ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে। এতে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা হয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সময়ে আমদানি ব্যয় ও জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকির চাপও বেড়েছে। দেশের বাজারে তুলনামূলক কম দামের কারণে সীমান্ত দিয়ে জ্বালানি পাচারের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছিল বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এর আগে এপ্রিল ও জুনেও দেশে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল। এরপর জুলাই ও আগস্ট এবং সেপ্টেম্বরের শুরুতে দাম অপরিবর্তিত ছিল। ফলে সেপ্টেম্বরে ২০ টাকা করে দাম বাড়ানো এ বছরের তৃতীয় দফা বড় ধরনের মূল্য সমন্বয়।
এদিকে ১ জুলাই থেকে সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হয়েছে। নতুন কাঠামোয় ২০তম গ্রেডের সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে। অর্থাৎ সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ বেড়েছে।
তবে নতুন বেতন কাঠামো একবারে পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৯ম গ্রেড ও তার ঊর্ধ্বের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন ও পুরোনো মূল বেতনের পার্থক্যের ৪০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা ৫০ শতাংশ পাবেন। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এ হার যথাক্রমে ৭০ ও ৭৫ শতাংশ হবে। ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে পূর্ণ হারে নতুন মূল বেতন কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
এমন সময়ে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যখন দেশে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে রয়েছে। পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট হিসাবে আগস্টে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। এর আগে জুলাইয়ে ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। ফলে বর্তমান মূল্যস্ফীতির হার সরকারের নির্ধারিত ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
এ পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতিতে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও নতুন পে-স্কেলের প্রভাব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে মুদ্রানীতি কমিটি। বিশেষ করে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি এবং ভোক্তা মূল্যসূচক বা মূল্যস্ফীতিতে এসব পদক্ষেপের প্রভাব কতটা পড়ে, তা মূল্যায়ন করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এসব বিষয় গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের পর বর্তমান নীতি সুদহারে পরিবর্তনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অর্থাৎ আপাতত নীতি সুদহার অপরিবর্তিত থাকছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কয়েক বছর ধরে নীতি সুদহার বাড়ানোর পর চলতি বছরের জুলাইয়ে তা কমানোর পথে যায় বাংলাদেশ ব্যাংক। ৩০ জুলাইয়ের মুদ্রানীতি কমিটির সভায় নীতি বা রেপো সুদহার ১০ শতাংশ থেকে ৫০ ভিত্তি পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়। নতুন হার ২ আগস্ট থেকে কার্যকর হয়।
এর আগে ২০২২ সালের শেষ দিক থেকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার ধারাবাহিকভাবে বাড়াতে থাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে ওঠার পরও কঠোর মুদ্রানীতির অংশ হিসেবে নীতি সুদহার বাড়ানো অব্যাহত ছিল। ২০২৪ সালের অক্টোবরে তা ১০ শতাংশে উন্নীত হয় এবং প্রায় দুই বছর ওই পর্যায়ে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় মুদ্রানীতি কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর মো. হাবিবুর রহমান, অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারপারসন ফেরদৌসী নাহার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ইমাম আবু সাঈদসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন