জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে অস্ত্রভাণ্ডার, তেল, মাদক জব্দ, কর্মসংস্থান, যুদ্ধ বন্ধ ও বিনিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়ে একাধিক দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এসব দাবির কয়েকটিকে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর হিসেবে চিহ্নিত করেছে মার্কিন বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)। সংস্থাটির তথ্যানুসন্ধান অনুযায়ী, ট্রাম্পের বেশ কিছু দাবি তার দ্বিতীয় মেয়াদের বিভিন্ন সময়ে করা বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি।
ভাষণে ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি অস্ত্র রয়েছে এবং দেশটি এমন বিপুল পরিমাণ অস্ত্র তৈরি করছে, যা আগে কখনো করা হয়নি। তবে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যের বরাতে এপি জানিয়েছে, এই দাবি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। মার্কিন সামরিক বাহিনী, ন্যাটো এবং মধ্যপ্রাচ্যের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডার ক্রমেই কমছে। টমাহক ক্রুজ মিসাইল এবং প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা পুনরায় মজুত করতে মার্কিন সামরিক ঠিকাদারদের কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। গত আগস্টে কর্মকর্তারা এপিকে জানিয়েছিলেন, ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের যুদ্ধের কারণে ইউরোপে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থার সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
ট্রাম্প আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলা মিলে বিশ্বের ৬০ শতাংশের বেশি তেলের মালিক। এপির তথ্যানুসন্ধানে এই হিসাবকে বাস্তবসম্মত নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আগস্টের শেষ দিকে ঘোষিত একটি চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ১৭টি তেলক্ষেত্রের ১০০ বছরের অধিকার পেয়েছে বলে জানানো হয়। এসব তেলক্ষেত্রে প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেল মজুত রয়েছে। তবে ভেনেজুয়েলার মোট অপরিশোধিত তেলের মজুত প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল। দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে বহু বছর সময় লাগতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এ ছাড়া বিশ্বে মোট প্রায় ১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ব্যারেল তেল মজুতের তুলনায় ভেনেজুয়েলার মজুত প্রায় ২২ শতাংশ।
মাদক নিয়েও ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র মাদকবাহী জলযানে ডজনখানেক হামলা চালিয়ে সমুদ্রপথে আসা মাদকের ৯৭ শতাংশ ধ্বংস করেছে। তবে এপির সঙ্গে কথা বলা বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। কারণ সমুদ্রপথে মোট কত পরিমাণ মাদক পাচার হচ্ছে, তা নির্ভুলভাবে জানা যায় না। হোয়াইট হাউস এপিকে শুল্ক ও সীমান্ত সুরক্ষা সংক্রান্ত তথ্য দেখার নির্দেশ দিলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, জব্দ করা মাদকের পরিমাণ দিয়ে মোট পাচারের পরিমাণ নির্ধারণ করা যায় না। এসব তথ্য নির্দিষ্ট সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জব্দ কার্যক্রমের চিত্র তুলে ধরে মাত্র।
কর্মসংস্থান নিয়ে ট্রাম্পের দাবি, বর্তমানে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি আমেরিকান কাজ করছেন। এপি বলছে, দাবিটি সত্য হলেও এর সঙ্গে প্রেক্ষাপট রয়েছে। প্রতি মাসে অর্থনীতিতে নতুন চাকরি যুক্ত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের পে-রোলে কর্মসংস্থানের সংখ্যা নিয়মিত নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়।
বেসরকারি খাতের চাকরি নিয়েও ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর ১০ লাখের বেশি নতুন চাকরি সৃষ্টির দাবি করেছেন। তবে মার্কিন সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এ সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ ৭ হাজার। এপির তথ্যানুসন্ধানে বলা হয়েছে, ঐতিহাসিক মানদণ্ডে এই বৃদ্ধিকে অস্বাভাবিকভাবে বড় বলা যায় না।
ট্রাম্প তার বক্তব্যে আটটি যুদ্ধ বন্ধ করার কৃতিত্বও দাবি করেন। তবে এপির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এসব ঘটনার মধ্যে এমন কিছু শান্তি প্রতিষ্ঠার ঘটনাও রয়েছে, যেখানে প্রকৃতপক্ষে কোনো যুদ্ধ চলছিল না। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান যুদ্ধও তার দাবির প্রেক্ষাপটে বিবেচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
বিশ্বজুড়ে ২১ ট্রিলিয়ন ডলারের নতুন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি পাওয়ার দাবিকেও এপি অতিরঞ্জিত ও অনুমাননির্ভর হিসেবে উল্লেখ করেছে। হোয়াইট হাউসের ওয়েবসাইটে বিনিয়োগের অঙ্ক ১১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের সময়ে করা কিছু বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এপি’র তথ্যানুসন্ধানে এসব বক্তব্যের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের দাবির সঙ্গে সরকারি তথ্য, বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যানের পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন