রোববার রাতে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানোর ঘোষণার পর থেকেই দেশের পণ্য পরিবহন খাতে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সরকার বা মালিক সমিতির পক্ষ থেকে নতুন ভাড়ার হার নির্ধারণ না হওয়ায় ট্রাক, লরি, পিকআপ ও কাভার্ড ভ্যান মালিকদের কেউ কেউ নিজেদের মতো করে ভাড়া বাড়িয়ে দিচ্ছেন। এতে জ্বালানি খরচ যতটা বেড়েছে, তার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি পরিবহন ব্যয় বহন করতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।
অঞ্চলভেদে পণ্য পরিবহনের ভাড়া ২ হাজার থেকে ৯ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। কোনো কোনো রুটে আগের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। আকস্মিক এই ভাড়াবৃদ্ধির সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে কাঁচামাল ও নিত্যপণ্যের ব্যবসায়ীদের ওপর।
যশোর থেকে ঢাকায় সবজি পরিবহনকারী আড়তদার আমির হোসেন জানান, মাত্র দুদিন আগেও একটি ট্রাকে পণ্য আনতে ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা লাগত। কিন্তু মঙ্গলবার একই দূরত্বের জন্য তাকে ৩১ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। ২২ হাজার টাকা হিসাবে এই রুটে ভাড়া এক ধাক্কায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পুরোটা তাৎক্ষণিকভাবে পণ্যের দামের সঙ্গে সমন্বয় করলে বিক্রি কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই আপাতত কম লাভে পণ্য বিক্রি করছেন তারা। পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হলে ধীরে ধীরে বাড়তি পরিবহন ব্যয় পণ্যের দামের সঙ্গে সমন্বয় করার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশের অন্যান্য রুটেও প্রায় একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। টাঙ্গাইল থেকে যাত্রাবাড়ীতে কার্টন পরিবহনকারী ট্রাকচালক মোহাম্মদ কামাল হোসেন জানান, তেলের দাম বাড়ার কারণে মালিক আগে যেখানে ১০ হাজার টাকা ভাড়া নিতেন, এখন তা বাড়িয়ে ১২ হাজার টাকা নির্ধারণ করেছেন।
ঢাকা-বগুড়া রুটের চালক আসলাম হক জানান, আগে এ পথে একটি ট্রিপে ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা লাগলেও এখন ৩০ হাজার টাকার নিচে ট্রিপ চালানো সম্ভব হচ্ছে না। একইভাবে ভোলা থেকে ঢাকায় মালামাল পরিবহনের ভাড়া ৪০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৫ হাজার টাকা করা হয়েছে বলে জানান ট্রাকচালক আলাল মিয়া।
সবচেয়ে বেশি অসামঞ্জস্য দেখা যাচ্ছে দেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক রুট ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে। ট্রাকচালকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ রুটে একবার যাতায়াতে একটি ট্রাকে প্রায় ১০০ থেকে ১১০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়লে জ্বালানি খরচ সর্বোচ্চ প্রায় ২ হাজার ২০০ টাকা বাড়ার কথা।
কিন্তু বাস্তবে এ রুটে ট্রাকভাড়া ৩০-৩১ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩৮ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ডালজাতীয় পণ্য ঢাকায় আনা এক পাইকারি ব্যবসায়ী বলেন, ‘তেলের দাম যা বেড়েছে, তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বেড়েছে ট্রাকভাড়া।’
এদিকে বাড়তি ভাড়া নিয়ে গ্রাহকদের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডা এড়াতে অনেক চালক ও মালিক সাময়িকভাবে গাড়ি চালানো বন্ধ রেখেছেন। যাত্রাবাড়ী কাঁচাবাজারে পণ্য পরিবহনকারী পিকআপ চালক লিখন হোসেন জানান, নতুন ভাড়া নিয়ে গ্রাহকদের সঙ্গে ঝামেলা এড়াতে তিনি আপাতত বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। নতুন ভাড়ার হার কিছুটা স্থিতিশীল হলে গাড়ি রাস্তায় নামাবেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন দর অনুযায়ী দ্রুত পণ্য পরিবহনের একটি সুনির্দিষ্ট ও যৌক্তিক ভাড়ার তালিকা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। বর্তমানে ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা লিটারে বিক্রি হচ্ছে। দ্রুত পরিবহন ভাড়া নির্ধারণ করা না হলে বাড়তি পরিবহন ব্যয়ের প্রভাব শেষ পর্যন্ত নিত্যপণ্য ও অন্যান্য পণ্যের দামে গিয়ে পড়বে, যার চূড়ান্ত মাশুল গুনতে হবে সাধারণ ভোক্তাদের।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন