সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা হয়েছে। এ মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) শুনানি শেষে ঢাকার আদালত গাজী নজরুল ইসলামের চার দিন এবং মাকছুদা ইসলামের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শেরেবাংলা নগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শামসুজ্জোহা সরকার দুজনেরই সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিলেন।
মরিয়মের বাবা মো. মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলাটি করেন। মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম এবং ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ওবায়দুর রহমান পলাতক রয়েছেন।
এর আগে রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলার ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাটের একটি কক্ষ থেকে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় মরিয়মের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ওই কক্ষ থেকে হাতে লেখা কয়েকটি চিরকুট জব্দ করা হয়। চিরকুটগুলো মরিয়মের নিজের লেখা কি না, তা যাচাই করছে পুলিশ।
পুলিশ সূত্র জানায়, কয়েকটি চিরকুট সাদা কাগজে কালো ও লাল কালি দিয়ে লেখা। এর মধ্যে একটি ‘বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ’ লেখা প্যাডেও লেখা রয়েছে। এসব লেখার সত্যতা যাচাইয়ে পরীক্ষা চলছে।
সোমবার দুপুরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে মেডিকেল বোর্ডের তত্ত্বাবধানে মরিয়মের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। পরীক্ষার জন্য তাঁর মস্তিষ্ক ও হৃদ্যন্ত্রের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। হাই ভ্যাজাইনাল সোয়াব ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে এবং ভিসেরা পরীক্ষার জন্যও নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে বলে মর্গ সূত্রে জানা গেছে।
শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ফরেনসিক বিভাগে জমা দিয়েছে। প্রাথমিকভাবে মরদেহে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি; তবে গলায় ফাঁসের দাগ রয়েছে। ময়নাতদন্ত ও অন্যান্য পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে।
মরিয়মের মৃত্যুর কারণ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পারিবারিক ও সামাজিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাঁর মধ্যে অভিমান, ক্ষোভ বা হতাশা তৈরি হয়েছিল কি না, তদন্তে তা-ও দেখা হচ্ছে। তবে এসব বিষয় এখনো নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি।
মেট্রোপলিটন পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান বলেন, মরিয়মের বাবা আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেছেন। মামলায় তাঁর মেয়ের স্বামী গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রীকে আসামি করা হয়েছে।
মরিয়মকে নির্যাতন করা হতো কি না—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে। তবে এ মুহূর্তে পুলিশের কাছে এ ধরনের কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই।
তিনি আরও জানান, মরিয়মের মৃত্যুর সময় গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রী ন্যাম ভবনের ওই ফ্ল্যাটে ছিলেন। মরদেহ উদ্ধারের সময় তাদের পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। পরে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
আদালতে গাজী নজরুল ইসলাম তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, অভিযোগগুলো মিথ্যা এবং মরিয়ম নিজেই আত্মহত্যা করেছেন।
এদিকে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে নির্বাচিত হন গাজী নজরুল ইসলাম। পরে তাঁর একটি ব্যক্তিগত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় দলীয়ভাবে তদন্ত করা হয়।
জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, সাংগঠনিক তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২২ জুলাই তাঁকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে জানানোর সিদ্ধান্তের কথাও জানায় দলটি।
মরিয়মের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, চিরকুটগুলোর লেখক এবং আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগের সত্যতা ময়নাতদন্ত, ফরেনসিক পরীক্ষা ও তদন্তের অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন