বাংলাদেশের রিটেইল ব্যাংকিং ও ক্রেডিট কার্ড ব্যবসা বিক্রি করতে আগ্রহী বহুজাতিক ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড। ব্যাংকটির এই ব্যবসা অধিগ্রহণে আগ্রহ দেখিয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় দুই ব্যাংক—ব্র্যাক ব্যাংক ও সিটি ব্যাংক। এ নিয়ে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের সঙ্গে পৃথকভাবে বৈঠকও করেছে ব্যাংক দুটি।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট তিন ব্যাংকের একাধিক সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়নি। ফলে আগ্রহী ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সূত্র জানায়, চলতি বছরের জুলাইয়ে বাংলাদেশে রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার আগ্রহের কথা জানায় স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড। এরপর দেশের কয়েকটি ব্যাংক তাদের রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসার অংশ অধিগ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করে। আলোচনায় বর্তমানে ব্র্যাক ব্যাংক ও সিটি ব্যাংক এগিয়ে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
এদিকে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের প্রধান ও আঞ্চলিক কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করে রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা নিয়ে তাদের পরিকল্পনার বিষয়টি অবহিত করেছেন বলে জানা গেছে।
রিটেইল ব্যাংকিংয়ে বড় পরিসর
বাংলাদেশে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসায় আমানত রয়েছে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে ঋণের পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ব্যাংকটির রিটেইল সেবার মধ্যে রয়েছে সঞ্চয়ী ও চলতি হিসাব, স্থায়ী ও বৈদেশিক মুদ্রার আমানত, বিভিন্ন ধরনের ক্রেডিট কার্ড, ব্যক্তিগত ঋণ, গাড়ি ঋণ এবং বাড়ি কেনা বা সংস্কারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঋণ।
এ ছাড়া ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক ‘স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড সাদিক’ সেবার আওতায় ডিপিএস, কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ও ইসলামিক ক্রেডিট কার্ড রয়েছে। অনাবাসী বাংলাদেশিদের জন্য রয়েছে ‘স্বদেশী ব্যাংকিং’ সেবা।
সিটি ব্যাংকের ভোক্তা ঋণ বাড়তে পারে
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সিটি ব্যাংকের ব্যক্তি পর্যায়ের আমানত রয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে ব্যক্তিগত, গাড়ি ও বাড়িসহ ভোক্তা ঋণের পরিমাণ প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যবসা অধিগ্রহণ করতে পারলে সিটি ব্যাংকের ভোক্তা ঋণের স্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত সিটি ব্যাংকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা বিক্রির উদ্যোগের কথা জানার পরই তারা আগ্রহ প্রকাশ করেন। এর আগে আমেরিকান এক্সপ্রেসের (অ্যামেক্স) কার্ড ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়ে সিটি ব্যাংক ইতিবাচক ফল পেয়েছে বলেও জানান তিনি।
তবে তাঁর ভাষ্য, অধিগ্রহণের আগে বিভিন্ন পর্যায়ের অনুমোদন প্রয়োজন হবে এবং পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে সময় লাগতে পারে।
ব্র্যাক ব্যাংকেরও আগ্রহ
ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যক্তি পর্যায়ের আমানত প্রায় ৫৩ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকটির মোট আমানত এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অন্যদিকে ভোক্তা ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা।
ব্র্যাক ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের সঙ্গে প্রাথমিকভাবে একটি সভা হয়েছে। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। অধিগ্রহণের আগে মূল্য নির্ধারণসহ বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হবে, যা একটি জটিল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া।
বিশ্বব্যাপী ব্যবসা পুনর্গঠন করছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড
এর আগে ব্যবসায়িক কৌশল পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড অ্যাঙ্গোলা, ক্যামেরুন, গাম্বিয়া, জর্ডান, লেবানন, সিয়েরা লিওন ও জিম্বাবুয়ে থেকে স্থানীয় ব্যাংকিং কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
এ ছাড়া তানজানিয়া ও আইভরি কোস্টে কনজ্যুমার, প্রাইভেট ও বিজনেস ব্যাংকিং থেকে সরে গেলেও করপোরেট ও ইনস্টিটিউশনাল ব্যাংকিং চালু রাখে ব্যাংকটি। পরে শ্রীলঙ্কায় সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসাও বিক্রি করে দেয়।
বাংলাদেশে রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা নিয়ে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের অবস্থান জানতে চাইলে ব্যাংকটির করপোরেট অ্যাফেয়ার্স, ব্র্যান্ড অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের প্রধান বিটপী দাশ চৌধুরী লিখিত বক্তব্যে বলেন, বাজার-সংক্রান্ত গুঞ্জন বা জল্পনা-কল্পনার বিষয়ে ব্যাংকটি মন্তব্য করে না।
তিনি জানান, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড গ্রুপ নিয়মিতভাবে বৈশ্বিক ব্যবসায়িক মডেলের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী গ্রাহকদের জন্য সুবিধাজনক জায়গায় সম্পদ কেন্দ্রীয়করণের ব্যবস্থা নেয়।
বাংলাদেশের বাজার সম্পর্কে তিনি বলেন, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড একটি বৈশ্বিক ব্যাংক এবং দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এ দেশে ব্যাংকটির শক্তিশালী উপস্থিতি ও দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে এবং বাংলাদেশের প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি অব্যাহত রয়েছে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন