১০ হাজার কোটি টাকার কৃষিঋণ কর্মসূচির অর্থ দ্রুত প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে ব্যাংকগুলোকে তাগাদা দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে বড় অঙ্কের ঋণ স্বল্প সময়ে বিতরণের চাপ থাকায় গ্রাহক যাচাই-বাছাইয়ে ঘাটতি হলে অনিয়ম ও ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।
সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, এ কর্মসূচির আওতায় ৪২টি ব্যাংকের জন্য মোট ৯ হাজার ১৯০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তির পর ব্যাংকগুলোকে এ অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। ব্যাংক ঋণ বিতরণের তথ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানানোর পর বিতরণ করা ঋণের বিপরীতে অর্থ ছাড় করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক এক বৈঠকে গভর্নরের পক্ষ থেকে ব্যাংকগুলোকে দ্রুত কৃষিঋণ বিতরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেপ্টেম্বরের মধ্যে ২৫ শতাংশ এবং ডিসেম্বরের মধ্যে পুরো অর্থ বিতরণের লক্ষ্য নিয়ে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বরের মধ্যে ২৫ শতাংশ এবং ডিসেম্বরের মধ্যে ১০০ শতাংশ ঋণ বিতরণের বিষয়ে কোনো লিখিত নির্দেশনা নেই।
তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুততম সময়ে সঠিক গ্রাহকের হাতে ঋণ পৌঁছানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে শুধু লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করাই উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নয়; ঋণ দেওয়ার পর তা আদায়ও করতে হবে।
আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংকগুলোর সঙ্গে চুক্তির আওতায় ঋণ বিতরণ করা হবে। বিতরণের পর ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাবে কত টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এরপর সে অনুযায়ী অর্থ দেওয়া হবে।
কৃষি ব্যাংক পেল সর্বোচ্চ বরাদ্দ
৯ হাজার ১৯০ কোটি টাকা বরাদ্দের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ পেয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। ব্যাংকটির জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ২ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৯৪৮ কোটি টাকা পেয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। তৃতীয় সর্বোচ্চ ৭৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব)।
এ ছাড়া সোনালী ব্যাংককে ৬৮৪ কোটি টাকা এবং ব্র্যাক ব্যাংককে ৪৩৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
শীর্ষ পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে তিনটিই রাষ্ট্রায়ত্ত—বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি কোনো ব্যাংকের জন্য কৃষিঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়নি। আগের বছর সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কত কৃষিঋণ বিতরণ করেছে, সেই অর্জনসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংকগুলো নিজেদের লক্ষ্যমাত্রার প্রস্তাব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে পাঠায়। পরে সেই প্রস্তাবের ভিত্তিতে বরাদ্দ ও ঋণ বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়।
কোন অঞ্চল বা শাখায় কত টাকা বিতরণ করা হবে, সেটিও বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারণ করে দেয় না। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় নিজস্ব চাহিদা ও পরিস্থিতি বিবেচনায় অঞ্চল ও শাখাভিত্তিক অর্থের পরিমাণ নির্ধারণ করে।
প্রকৃত কৃষক বাছাইয়ে গুরুত্ব
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, দ্রুত ঋণ বিতরণের অর্থ যাচাই-বাছাই বাদ দিয়ে ঋণ দেওয়া নয়। ব্যাংকগুলোকে মাঠপর্যায়ে গিয়ে গ্রাহকের কৃষিকাজ, ঋণের প্রয়োজনীয়তা ও পরিশোধ সক্ষমতা যাচাই করতে হবে।
কোন এলাকায় কৃষিঋণের চাহিদা বেশি, কোথায় কী ধরনের কৃষিকাজ হচ্ছে এবং কোন খাতে অর্থায়নের প্রয়োজন রয়েছে—এসব তথ্য বিবেচনায় নিয়ে গ্রাহক তৈরি করতে বলা হয়েছে।
শুধু কাগজপত্রের ওপর নির্ভর না করে ঋণপ্রার্থী প্রকৃতপক্ষে কৃষিকাজ করেন কি না, সেটিও যাচাই করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, শুধু লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য দ্রুত ঋণ বিতরণ করা হলে পরবর্তী সময়ে ঋণের একটি অংশ খেলাপিতে পরিণত হতে পারে। একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নামে ঋণ দেওয়াসহ অতীতে যে ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে, তাড়াহুড়ো করে বিতরণ করা হলে সেসব ঝুঁকি আবারও দেখা দিতে পারে।
ব্যাংকারদের উদ্বেগ
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে ১০ হাজার কোটি টাকার কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন। চলতি অর্থবছরের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা পূরণের চেষ্টা করা হবে, তবে তাড়াহুড়ো করে ঋণ বিতরণ করলে প্রকৃত কৃষকেরা বঞ্চিত হতে পারেন।
ওই কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ইতোমধ্যে ৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকা বিতরণ করেছে।
অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে শতভাগ ঋণ বিতরণের বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়ার বিষয়টি তিনি জানেন। ব্যাংকটি লক্ষ্যমাত্রা পূরণে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
এজেন্টনির্ভর বিতরণেও নজরদারির প্রয়োজন
সংশ্লিষ্ট সার্কুলার অনুযায়ী, কর্মসূচির ঋণ এজেন্টের মাধ্যমে বিতরণের ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে এজেন্টনির্ভর ঋণ বিতরণে যথাযথ নজরদারি না থাকলে দালালনির্ভরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অতীতে কৃষিঋণ বিতরণে মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে ঋণ নেওয়া, কমিশন আদায় কিংবা প্রকৃত কৃষকের পরিবর্তে অন্য ব্যক্তির নামে ঋণ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। ফলে এজেন্টের মাধ্যমে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রেও গ্রাহক যাচাই ও তদারকি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে, ১০ হাজার কোটি টাকার কৃষিঋণ কর্মসূচিতে দ্রুত অর্থ ছাড় ও বিতরণের পাশাপাশি প্রকৃত কৃষক শনাক্ত করা, ঋণের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে ঋণ আদায়ের সক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়াকে গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থান হলো, কৃষকের প্রয়োজনের সময়ে ঋণ পৌঁছে দেওয়া জরুরি হলেও শুধু লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য ঋণ বিতরণ করা যাবে না। দ্রুততার সঙ্গে যথাযথ যাচাই-বাছাই নিশ্চিত করাই এ কর্মসূচির মূল চ্যালেঞ্জ।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন