দেশে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি মধ্যবর্তী পণ্য উৎপাদনে অর্থায়ন বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)। এ উদ্যোগের আওতায় সাধারণ উদ্যোক্তাদের সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা এবং নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক ক্লাস্টারে মধ্যবর্তী পণ্য উৎপাদনকারী উদ্যোক্তাদের সর্বোচ্চ ২ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা-বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ তথ্য জানান পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের।
তিনি বলেন, একটি ক্ষুদ্র উদ্যোগে একজনের কর্মসংস্থান হলে উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থার ফরওয়ার্ড ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজের মাধ্যমে আরও প্রায় চারজনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। তাই শুধু উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়ানোর পরিবর্তে পুরো উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে বিবেচনায় নিয়ে অর্থায়ন করতে চায় পিকেএসএফ।
ফজলুল কাদের বলেন, উৎপাদন বাড়লে সরবরাহকারী, পরিবেশক ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাতেও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। এ কারণে কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকে সামনে রেখে পিকেএসএফ তার অর্থায়ন কৌশলে পরিবর্তন আনছে।
কাঁচামালে মূল্য সংযোজনের উদ্যোগ
পিকেএসএফের নতুন অর্থায়ন কৌশলের অন্যতম লক্ষ্য হলো কাঁচামালে মূল্য সংযোজন করে উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনে উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা।
ফজলুল কাদের বলেন, বাংলাদেশকে শুধু প্রাথমিক পণ্য উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে না রেখে কাঁচামালে যতটা সম্ভব মূল্য সংযোজন করতে হবে। এ লক্ষ্যে দুধ থেকে ঘি, লাবান, চিজ ও বিভিন্ন ধরনের পানীয় এবং আম থেকে পাল্প, ভিনিগারসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত পণ্য উৎপাদনে উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, এ ধরনের উদ্যোগে সাধারণ ক্ষুদ্রঋণের তুলনায় বেশি মূলধনের প্রয়োজন হয়। তাই অর্থায়নের সীমা বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সাধারণ উদ্যোক্তাদের জন্য সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা এবং ব্যবসায়িক ক্লাস্টারে মধ্যবর্তী পণ্য উৎপাদনকারী উদ্যোক্তাদের জন্য সর্বোচ্চ ২ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
মধ্যবর্তী পণ্য উৎপাদনে গুরুত্ব
মধ্যবর্তী পণ্য উৎপাদনের সম্ভাবনা বোঝাতে ভৈরবের জুতা শিল্পের উদাহরণ দেন পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি জানান, ভৈরবে কয়েক হাজার জুতা কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় জুতার সোলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ঝুট থেকে সোল উৎপাদন করা সম্ভব হলেও এ ধরনের উদ্যোগে তুলনামূলক বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন।
ফজলুল কাদের বলেন, মানুষ সরাসরি শুধু সোল কেনে না; জুতার কারখানাগুলো সোল কেনে। তাই এগুলোকে মধ্যবর্তী পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ ধরনের ক্ষুদ্র উৎপাদন উদ্যোগকে সহায়তা করা হলে নতুন পণ্য তৈরির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট শিল্পেও কর্মসংস্থান বাড়বে।
পুরো মূল্য ও সরবরাহ শৃঙ্খলকে অর্থায়নের আওতায় আনার পরিকল্পনা
পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, একটি ক্ষুদ্র উদ্যোগকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে এর প্রকৃত কর্মসংস্থান প্রভাব বোঝা যায় না। একটি উদ্যোগের সঙ্গে কাঁচামাল সরবরাহ, উৎপাদন, পরিবহন, বিপণন ও বিতরণের বিভিন্ন পর্যায় যুক্ত থাকে। তাই কর্মসংস্থান বাড়াতে পুরো মূল্য ও সরবরাহ শৃঙ্খলকে অর্থায়নের আওতায় আনতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।
প্রায় ৩৬ বছর ধরে উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কাজ করছে পিকেএসএফ। ফজলুল কাদের বলেন, এখন শুধু অর্থায়নের পরিমাণ বাড়ানোর দিকে নয়, অর্থায়নের ফলাফলের দিকেও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অর্থায়নের মাধ্যমে কতটা কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, পিকেএসএফের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ৫ হাজার কোটি টাকার একটি ক্রেডিট লাইন করেছে। এর প্রথম কিস্তির অর্থ ইতোমধ্যে ছাড় হয়েছে।
ফজলুল কাদের বলেন, পিকেএসএফের ঋণ আদায়ের হার দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ৯৯ শতাংশ। আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রেখে এখন অর্থায়নের পাশাপাশি উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ফলাফলকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
৪০০টির বেশি ভ্যালু চেইনে কাজ
ভ্যালু চেইন উন্নয়নে পিকেএসএফের কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে ফজলুল কাদের বলেন, কিছু সমস্যা শুধু ঋণ দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। এ কারণে ভ্যালু চেইনে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও অন্যান্য সহায়তা দিতে সরকারের পক্ষ থেকে অনুদানের ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
তিনি জানান, পিকেএসএফ ইতোমধ্যে ৪০০টির বেশি ভ্যালু চেইন নিয়ে কাজ করেছে। এসব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সরকারের সহযোগিতায় কার্যক্রম দেশব্যাপী সম্প্রসারণ করা হবে। এর মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি আরও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন