কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী কিশোর ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর দেশে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে দেশে অন্তত ১৫৫ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। একই সময়ে নিখোঁজের পর মাটিচাপা অবস্থায় কিংবা নদী থেকে আরও অন্তত ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
আসকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নিহত ১৫৫ শিশুর মধ্যে ৬৮ জন শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছে। পারিবারিক পরিসরে নির্যাতনের ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ৪৯ শিশুর। এছাড়া ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে অন্তত ২৬ শিশুকে। এর মধ্যে দুজন ছেলে শিশুও রয়েছে।
ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যা করা হয়েছে আরও চার শিশুকে। পাশাপাশি গুলিতে, গৃহকর্মী হিসেবে নির্যাতন, উত্ত্যক্তকারীর হামলা এবং অপহরণের পর হত্যার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এর বাইরে আত্মহত্যা, রহস্যজনক মৃত্যু এবং বিভিন্ন ঘটনায় শুধু মরদেহ উদ্ধারের আরও ৯৯টি ঘটনা নথিভুক্ত করেছে আসক।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা শিশুদের নিরাপত্তাহীনতার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। জামালপুরের মাদারগঞ্জে সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করার অভিযোগ ওঠে তারই এক সহপাঠীর বাবার বিরুদ্ধে। পরে ওই শিশুর মরদেহ অভিযুক্তের বাড়ির মেঝেতে মাটিচাপা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
পাবনা সদরে ১০ বছরের এক শিশু নিখোঁজ হওয়ার সাত দিন পর একটি ডোবা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাকেও ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া লক্ষ্মীপুর, রংপুর ও মাদারীপুরে পরিবারের সদস্যদের হাতে শিশু হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। সর্বশেষ সুনামগঞ্জে এক বাবা নিজের তিন শিশুসন্তানকে বিষ খাইয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে।
শুধু হত্যাকাণ্ড নয়, শিশু নিখোঁজের ঘটনাও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, যা মোট নিখোঁজের প্রায় ৮৭ শতাংশ। তবে এখনো ২ হাজার ৩৮ শিশু নিখোঁজ রয়েছে।
সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে দেশে মোট ২ হাজার ৩৬২টি হত্যা মামলা হয়েছে। অর্থাৎ এ সময়ে গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ২৯৫টি হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়েছে।
শিশু হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে ইউনিসেফ। সংস্থাটি ঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সমাজের প্রতিটি পরিসরে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করার আহ্বান জানিয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা ইকবাল শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, খেলার মাঠ, পরিচিত পরিবেশ কিংবা নিজের পরিবার—কোথাও যদি শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে তাদের জন্য নিরাপদ জায়গা কোথায়?
তার মতে, অপরাধীদের বিকৃত মানসিকতা, প্রতিশোধস্পৃহা কিংবা বড়দের বিরোধের বলি হচ্ছে নিষ্পাপ শিশুরা। এসব ঘটনার দ্রুত তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা গেলে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়বে এবং এ ধরনের অপরাধ কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন