হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরাণ (রহ.)-এর স্মৃতিধন্য পুণ্যভূমি সিলেট। দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত সিলেটবাসী। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) প্রথমবারের মতো সিলেট সফরে যাচ্ছেন তিনি।
এক দিনের এই সফরে দুই আউলিয়ার মাজার জিয়ারতের পাশাপাশি সিলেট নগরবাসীর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও নাগরিক সংবর্ধনায় অংশ নেবেন রাষ্ট্রপতি।
সফর ঘিরে সাজসজ্জা ও নিরাপত্তা
রাষ্ট্রপতির সফরকে কেন্দ্র করে গত কয়েক দিনে সিলেট নগরের চিত্র বদলে গেছে। তাঁর যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে সংস্কার, পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থাপনায় দেওয়া হয়েছে নতুন রং।
রাষ্ট্রপতির সফর নির্বিঘ্ন করতে গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রায় ১ হাজার ২০০ পুলিশ সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
রাষ্ট্রপতির সফরকে কেবল আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি হিসেবে দেখছেন না স্থানীয়রা। দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থাকা একজন রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ হিসেবে দেখছেন তারা। ফলে সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রপতিকে অভ্যর্থনা জানানোর আগ্রহও দেখা গেছে।
থাকছে মাজার জিয়ারত ও নাগরিক সংবর্ধনা
রাষ্ট্রপতির সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরাণ (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত। বিকেলে সিলেট সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনায় অংশ নেবেন তিনি।
সংবর্ধনায় সিলেটের বিশিষ্ট নাগরিক, শিক্ষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, রাজনৈতিক নেতা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এই আয়োজনের মাধ্যমে সিলেটের উন্নয়ন, যোগাযোগব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন, পরিবেশ ও নাগরিক সমস্যাগুলো জাতীয় পর্যায়ে আরও গুরুত্ব পাবে।
সিলেটের অর্থনীতি, প্রবাসী আয়, পর্যটন, শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, বৃহৎ প্রবাসী জনগোষ্ঠী এবং পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনার কারণে দেশের অর্থনীতিতে এ অঞ্চলের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবনও দীর্ঘ। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পড়ার সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতৃত্বে ছিলেন।
স্বাধীনতার পর শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজে অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজেও শিক্ষকতা করেন। ১৯৮৬ সালে শিক্ষকতা ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন।
১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। পরে ১৯৯০ সালে বিএনপিতে যোগ দেন এবং ধাপে ধাপে দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসেন। ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হন।
২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই সময় তিনি কৃষি এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তী সময়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান তিনি। ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে দলের পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং ২০১১ সালের মার্চে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব নেন। ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ বিএনপির মহাসচিব হন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মামলা, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও বিএনপির নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ে পরিবর্তন এসেছে। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থেকে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন। ফলে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব থেকে সরে এসে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
যে সময়সূচিতে সিলেট সফর
সফরসূচি অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল ১১টা ১৫ মিনিটে রাষ্ট্রপতি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছাবেন। সেখান থেকে মোটরকেডযোগে সকাল ১১টা ৫০ মিনিটে সিলেট সার্কিট হাউসে যাবেন এবং সেখানে গার্ড অব অনার গ্রহণ করবেন।
দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটে তিনি হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করবেন। এরপর দুপুর ১টা ২৫ মিনিটে যাবেন হযরত শাহপরাণ (রহ.)-এর মাজারে।
পরে বিকেলে সিলেট সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনায় অংশ নেবেন রাষ্ট্রপতি। সংবর্ধনা শেষে তাঁর ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেওয়ার কথা রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুলের প্রথম সিলেট সফর তাই শুধু রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা ও সিলেটবাসীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের যোগাযোগের কারণে সফরটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন