প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের টাঙ্গাইল সফরকে কেন্দ্র করে প্রায় ৬৩ লাখ টাকার উন্নয়নমূলক কাজ হাতে নেয় টাঙ্গাইল পৌরসভা। পৌরসভার রাজস্ব খাতের অর্থে নেওয়া এসব কাজে নিয়মবহির্ভূতভাবে ঠিকাদার নির্বাচন, কাজ সম্পন্ন না করেই বিল উত্তোলন এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
পৌরসভার নথিপত্র, ওয়ার্ক অর্ডার ও বিল-ভাউচার পর্যালোচনা এবং সরেজমিনে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এসব অভিযোগের কথা জানা গেছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদাররা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ১৪ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর টাঙ্গাইল সফর উপলক্ষে ৪ এপ্রিল রাজস্ব খাত থেকে প্রায় ৬৩ লাখ টাকার একাধিক উন্নয়নমূলক কাজ হাতে নেওয়া হয়। এসব কাজের মধ্যে ছিল বিভিন্ন সড়কে রোড মার্কিং, রাস্তা মেরামত, সড়ক কার্পেটিং, পৌর উদ্যানে ইটের সলিং এবং বিভিন্ন স্থাপনায় রং করা।
জেলা সদর রোডের অ্যাডভোকেট বার সমিতি থেকে হেলিপ্যাড ও দেউলা কালিবাড়ী রোড কার্পেটিংয়ের জন্য ১৫ লাখ ৬৫ হাজার ৪৪১ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, কোনো ধরনের দরপত্র ছাড়াই কাজটি এনবি এন্টারপ্রাইজকে দেওয়া হয়।
সরেজমিনে দেউলা কালিবাড়ী রোডে গিয়ে কোনো কাজ করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ওই কাজের বিল ঠিকাদার উত্তোলন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে ক্লাব রোড থেকে স্টেডিয়াম রোডে নামমাত্র কাজ করা হয়েছে বলে অভিযোগ। পৌর উদ্যানে ইটের সলিং করা হলেও প্রধানমন্ত্রীর সফর শেষ হওয়ার পরপরই সেগুলো তুলে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
একই প্যাকেজের আওতায় র্যাব অফিসের সামনে ও পার্ক বাজার গেটে সিসি ঢালাইয়ের কথা থাকলেও সেখানে পুরোনো রাস্তার ওপর সামান্য বিটুমিন দিয়ে কার্পেটিং ও রোড মার্কিং করা হয়েছে বলে অভিযোগ। এসব চারটি কাজের জন্য বরাদ্দ ছিল ২০ লাখ ৩২ হাজার ৯৯১ টাকা। কাজগুলো পায় মেসার্স রুপা এন্টারপ্রাইজ।
এ ছাড়া জেলা সদর রোড থেকে নিরা মোড় হয়ে অ্যাডভোকেট বার সমিতির সামনে এবং ড্যাফোডিল মোড় থেকে জেলা সদর রোড হয়ে শাহীন স্কুল পর্যন্ত রোড মার্কিংয়ের জন্য ৭ লাখ ৮ হাজার ১১৮ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কাজটির দায়িত্ব পায় মমিন অ্যান্ড জসিম এন্টারপ্রাইজ।
অভিযোগ রয়েছে, ড্যাফোডিল মোড় থেকে জেলা সদর রোড পর্যন্ত কোনো রোড মার্কিং করা হয়নি। জেলা সদর রোড থেকে শাহীন স্কুল পর্যন্তও নির্ধারিত সময়ে কাজ হয়নি। তবে স্থানীয়দের দাবি, গত আগস্টে সেখানে ৫৬ মিটার সড়কে রোড মার্কিং করা হয়।
পৌরসভার নথি অনুযায়ী, এসব কাজের পরিমাপ, বিল প্রস্তুত ও কাজ সম্পন্নের প্রত্যয়নপত্রে স্বাক্ষর করেছেন তৎকালীন পৌর প্রশাসক সঞ্জয় কুমার মহন্ত, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমান, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহজাহান আলী, সহকারী প্রকৌশলী মনিরুল ইসলাম এবং উপসহকারী প্রকৌশলী শামীম আল মামুন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পৌরসভার কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, স্থানীয় এক প্রভাবশালী বিএনপি নেতার কার্যালয়ে বসে এসব কাজের ঠিকাদার নির্ধারণ করা হয়। তাদের দাবি, তিনটি উন্নয়নমূলক কাজের জন্য প্রায় ৪৩ লাখ টাকা এবং শামসুল হক তরুণ সংস্কার ও রং, বিন্দুবাসিনী সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় ও রাইফেলস ক্লাবের দেয়ালে রংসহ অন্যান্য কাজের জন্য আরও প্রায় ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
তাদের আরও অভিযোগ, দরপত্র আহ্বানের মাত্র ১০ থেকে ১২ দিনের মধ্যে অধিকাংশ কাজ শেষ দেখিয়ে চূড়ান্ত বিল উত্তোলন করা হয়েছে।
তবে টাঙ্গাইল পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মনিরুল ইসলাম এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, নিয়ম অনুযায়ী সব কাজ সম্পন্ন করার পরই ঠিকাদারদের বিল দেওয়া হয়েছে। এতে কোনো অনিয়ম হয়নি।
পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
এদিকে স্থানীয়রা এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন