সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে তাদের পরিবার। রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সাগর-রুনির পরিবারের পক্ষে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর বরাবর এ অভিযোগ দাখিল করেন রুনির ভাই নওশের আলম রোমান।
অভিযোগে বলা হয়, ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাত ২টা থেকে সকাল ৭টার মধ্যে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় নির্মমভাবে খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক গোলাম মোস্তফা সারওয়ার (সাগর সরওয়ার) এবং এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন নাহার (রুনি)। দীর্ঘ ১৪ বছরেও এই হত্যাকাণ্ডের কোনো কিনারা হয়নি।
থানা পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ ও র্যাবের তদন্তের পর হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স বর্তমানে মামলাটির তদন্ত করছে। এর নেতৃত্বে রয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
তবে টাস্কফোর্স গঠনের প্রায় দুই বছর হতে চললেও তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ার কথা অভিযোগে উল্লেখ করেছে পরিবার। তারা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত হত্যাকারী ও দায়ীদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে।
অভিযোগটি কমপ্লেইন্ট রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩-এর ৮ ধারা অনুযায়ী মানবতাবিরোধী অপরাধের যথাযথ তদন্ত এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে।
তদন্তে নতুন তথ্যের দাবি
এর আগে গত ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে ট্রাইব্যুনালে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড নিয়ে নতুন কিছু তথ্য তুলে ধরা হয়। এরপরই ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেয় পরিবার।
সেই সংবাদ সম্মেলনে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর জোহা জানান, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি মামলায় জব্দ করা র্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল আহসানের ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ডিজিটাল অংশ পরে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা জব্দ করে।
এসব ডিভাইসে ২০০৭ সাল থেকে জিয়াউল আহসানের বিভিন্ন নথি ও সার্ভারের তথ্য পাওয়া গেছে। মুছে ফেলা কিছু ফাইলও উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
তথ্য বিশ্লেষণ করে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ‘তিন থেকে চারজন’ সন্দেহভাজনকে চিহ্নিত করার কথা জানান তানভীর জোহা।
একজনকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি আরও বলেন, হত্যাকাণ্ডের আগের দিন রাত ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে তৎকালীন র্যাব কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানকে বলা হয়েছিল, পরদিন একটি ‘জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা’ ঘটবে এবং তাকে সেখানে উপস্থিত থাকতে হবে। এর পরদিন সকালে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সামনে আসে।
তদন্তে তৎকালীন সরকার বা গণমাধ্যম-সংক্রান্ত কোনো স্পর্শকাতর নথি, ডিস্ক, টেপ কিংবা মেমোরির সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্র থাকতে পারে বলে ধারণা পাওয়ার কথাও জানান তিনি।
ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সে সময় বলেছিলেন, অভিযোগটি ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারের মধ্যে পড়লে তা গ্রহণ করা হবে। তদন্তে একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য যোগসূত্র এবং কোনো সামরিক বা র্যাব কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছিলেন তিনি।
দ্রুত বিচার চান পরিবার
দীর্ঘদিন পর তদন্তে নতুন তথ্য আসায় আশাবাদ প্রকাশ করেছিলেন সাগর-রুনির ছেলে মাহির সরওয়ার মেঘ।
তিনি বলেন, তিনি যথাযথ বিচার চান। একই সঙ্গে কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন ভুলভাবে মামলায় জড়িত না হন, সেটিও নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে রুনির ভাই নওশের আলম রোমান তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, টাস্কফোর্সের তদন্ত কার্যত শূন্যের কোঠায় রয়েছে। ১৪ বছর ধরে যে অবস্থায় ছিল, এখনো সেখানেই আছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রকৃত হত্যাকারীদের শনাক্ত করে দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান রোমান।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন