ভারতের কাছে প্রায় ১৯০টি পরমাণু ওয়ারহেড থাকতে পারে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্টস (এফএএস)। পাশাপাশি নতুন করে তৈরি করা হচ্ছে এমন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার জন্য আরও প্রায় ৩০টি ওয়ারহেড রয়েছে বলেও ধারণা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
এফএএসের নিউক্লিয়ার ইনফরমেশন প্রজেক্ট ‘ইন্ডিয়াস নিউক্লিয়ার উইপনস–২০২৬’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। উন্মুক্ত উৎসের তথ্য, সরকারি নথি এবং বাণিজ্যিক স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করে এ হিসাব করা হয়েছে বলে জানিয়েছে এফএএস।
প্রতিবেদনে প্রকল্পটির পরিচালক হ্যান্স ক্রিস্টেনসেন বলেন, বর্তমানে ভারতের কাছে সক্রিয়ভাবে ব্যবহারের উপযোগী ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য বাহকের জন্য ১৬০টির বেশি ওয়ারহেড রয়েছে। পাশাপাশি নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার জন্য আরও ওয়ারহেড তৈরি করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত তার পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডার আধুনিকায়নের কাজও অব্যাহত রেখেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৪০ থেকে ২২৫ ওয়ারহেড তৈরির সক্ষমতা
এফএএসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারতের সামরিক সক্ষমতা ও পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের কৌশলসংক্রান্ত প্রকাশ্য তথ্য পর্যালোচনা করে ধারণা করা হচ্ছে, দেশটি প্রায় ১৯০টি পরমাণু ওয়ারহেড তৈরি করেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ভারত ১৪০ থেকে ২২৫টি পরমাণু ওয়ারহেড তৈরির মতো সামরিক কাজে ব্যবহারযোগ্য প্লুটোনিয়াম উৎপাদন করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১৯০টি ওয়ারহেড ইতোমধ্যে তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
তবে নতুন অস্ত্রব্যবস্থা তৈরির কাজ অব্যাহত থাকায় ভবিষ্যতে ভারতের পরমাণু ওয়ারহেডের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
নতুন অস্ত্রব্যবস্থা যুক্ত করছে ভারত
এফএএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক বছরে ভারত পরমাণু অস্ত্র বহনে সক্ষম বেশ কিছু নতুন অস্ত্রব্যবস্থা সামরিক বাহিনীতে যুক্ত করেছে। একই সঙ্গে আরও কয়েকটি ব্যবস্থা তৈরির কাজ চলছে।
ভারতের পরমাণু অস্ত্র বহনের সক্ষমতার মধ্যে রয়েছে যুদ্ধবিমান, স্থলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং সমুদ্রভিত্তিক ব্যবস্থা। নতুন ব্যবস্থাগুলো বিদ্যমান সক্ষমতার বিকল্প বা পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল প্যানেল অন ফিসাইল ম্যাটেরিয়ালসের হিসাব উদ্ধৃত করে এফএএস জানিয়েছে, ২০২৬ সালের শুরু পর্যন্ত ভারত প্রায় ৭৩০ কেজি অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহারযোগ্য প্লুটোনিয়াম উৎপাদন করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই হিসাবের ক্ষেত্রে প্রায় ১৭০ কেজি পর্যন্ত কমবেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
একটি পরমাণু ওয়ারহেড তৈরিতে আনুমানিক চার কেজি প্লুটোনিয়াম প্রয়োজন হলে, ভারতের উৎপাদিত প্লুটোনিয়াম দিয়ে তাত্ত্বিকভাবে ১৪০ থেকে ২২৫টি ওয়ারহেড তৈরি করা সম্ভব।
প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে অনিশ্চয়তা
তবে ভারতের পরমাণু অস্ত্রের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণে কিছু অনিশ্চয়তা রয়েছে। এর অন্যতম কারণ হলো দেশটি কী ধরনের পরমাণু ওয়ারহেড তৈরি করেছে, সে বিষয়ে প্রকাশ্য তথ্য সীমিত।
১৯৯৮ সালের পোখরান-২ পরমাণু পরীক্ষার মাধ্যমে ভারত ফিশন বা পরমাণু বিভাজনভিত্তিক অস্ত্রের নকশা তৈরির সক্ষমতা প্রমাণ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে উন্নত ফিশন ও থার্মোনিউক্লিয়ার অস্ত্র তৈরিতে ভারতের সক্ষমতা কতটা এগিয়েছে, তা নিশ্চিত নয়।
এফএএসের প্রতিবেদনের লেখকদের মতে, ভারতের তৈরি ওয়ারহেডের ধরন যা-ই হোক, দেশটি উৎপাদিত সব প্লুটোনিয়াম পরমাণু অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করেছে—এমনটা ধরে নেওয়ার কারণ নেই। এর একটি অংশ ভবিষ্যৎ ব্যবহারের জন্য মজুত থাকতে পারে।
‘নো ফার্স্ট ইউজ’ নীতিতে ভারত
১৯৯৮ সালের পোখরান-২ পরমাণু পরীক্ষার পর ভারত ‘নো ফার্স্ট ইউজ’ বা আগে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার না করার নীতি গ্রহণ করে। দেশটি এখনো এই নীতির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানিয়েছে।
সম্প্রতি ভারত সরকার সংসদে জানিয়েছে, বিশ্বাসযোগ্য ন্যূনতম প্রতিরোধক্ষমতা বজায় রাখা এবং আগে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার না করার নীতির প্রতি ভারত অঙ্গীকারবদ্ধ।
ভবিষ্যতে বাড়তে পারে অস্ত্রভাণ্ডার
এফএএসের মতে, ভারতের পরমাণু অস্ত্রের প্রকৃত সংখ্যা অনেকটাই নির্ভর করবে দেশটির হাতে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য অস্ত্রব্যবস্থার ওপর। এসব বাহক কতটি ওয়ারহেড বহনে সক্ষম, সেটিও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
সাধারণভাবে একটি দেশ তার বিদ্যমান পরমাণু অস্ত্র বহনকারী ব্যবস্থার সক্ষমতার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ওয়ারহেড তৈরি করবে—এমন সম্ভাবনা কম।
সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে এফএএস ভারতের পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডার প্রায় ১৯০টি ওয়ারহেড বলে অনুমান করেছে। নতুন অস্ত্রব্যবস্থা যুক্ত হলে ভবিষ্যতে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
তবে শেষ পর্যন্ত ভারতের হাতে কতটি পরমাণু ওয়ারহেড থাকবে, তা নির্ভর করবে অস্ত্র তৈরির উপযোগী প্লুটোনিয়ামের মজুত এবং সক্রিয় পরমাণু অস্ত্র বহনকারী ব্যবস্থার সংখ্যার ওপর।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন