সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে স্কেল-২০২৬-এর গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ইতোমধ্যে প্রজ্ঞাপনের রেজুলেশন বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয় (বিজি প্রেস) থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পৌঁছেছে। বর্তমানে এটি আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য রয়েছে। ভেটিং শেষ হলেই আনুষ্ঠানিকভাবে এসআরও নম্বর দিয়ে গেজেট প্রকাশ করা হবে।
সবকিছু ঠিক থাকলে শিগগিরই নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের পে স্কেল-সংক্রান্ত কাজে যুক্ত এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গত ২ সেপ্টেম্বর পে স্কেলের রেজুলেশন বিজি প্রেসে পাঠানো হয়েছিল। প্রক্রিয়া শেষে সেটি অর্থ মন্ত্রণালয়ে ফেরত আসে এবং পরে আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়। বর্তমানে ভেটিং কার্যক্রম চলছে।
তিনি বলেন, গেজেট প্রকাশে কোনো ধরনের অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব করতে চায় না সরকার। প্রক্রিয়াগত আনুষ্ঠানিকতার জন্য যতটুকু সময় প্রয়োজন, সেটুকুই লাগছে।
১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর
এর আগে গত সোমবার মন্ত্রিসভায় নবম জাতীয় পে স্কেল অনুমোদন করা হয়। নতুন বেতন কাঠামোর কার্যকারিতা ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে।
এর আগে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি চলতি সপ্তাহেই এ-সংক্রান্ত আদেশ জারির কথা জানিয়েছিলেন। তবে প্রশাসনিক ও আইনগত কিছু আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে সময় লাগছে।
নতুন জাতীয় বেতনস্কেলে সরকারি কর্মচারীদের বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। তবে প্রতিটি গ্রেডের মূল বেতন পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি বাড়ছে ২০তম গ্রেডে
নতুন কাঠামোয় সবচেয়ে বেশি শতাংশ হারে বেতন বাড়ছে ২০তম গ্রেডে। এ গ্রেডের সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা হবে। অর্থাৎ মূল বেতন বাড়ছে প্রায় ১৪২ শতাংশ।
অন্যদিকে প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হবে। অর্থাৎ সর্বোচ্চ মূল বেতনও দ্বিগুণ হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতিতে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নতুন কাঠামোয় তাদের তুলনামূলক বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
তিন ধাপে বাড়বে মূল বেতন
নতুন পে স্কেলে বেতন একবারে পুরোপুরি কার্যকর হবে না। ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডে বাড়তি মূল বেতনের অংশ তিন ধাপে কার্যকর করা হবে। প্রথম ধাপে বাড়তি অংশের ৫০ শতাংশ, দ্বিতীয় ধাপে ২৫ শতাংশ এবং তৃতীয় ধাপে অবশিষ্ট ২৫ শতাংশ যোগ হবে।
অন্যদিকে প্রথম থেকে নবম গ্রেডে বাড়তি অংশের ৪০ শতাংশ প্রথম ধাপে, ৩০ শতাংশ দ্বিতীয় ধাপে এবং বাকি ৩০ শতাংশ তৃতীয় ধাপে কার্যকর হবে।
উদাহরণ হিসেবে, ২০তম গ্রেডে বর্তমান ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে মূল বেতন ২০ হাজার টাকা হলে বাড়তি ১১ হাজার ৭৫০ টাকার ৫০ শতাংশ, অর্থাৎ ৫ হাজার ৮৭৫ টাকা প্রথম ধাপে যুক্ত হবে। এতে মূল বেতন দাঁড়াবে ১৪ হাজার ১২৫ টাকা। পরবর্তী দুই ধাপে ২ হাজার ৯৩৭ টাকা ৫০ পয়সা করে যোগ হয়ে শেষ পর্যন্ত মূল বেতন ২০ হাজার টাকায় পৌঁছাবে।
একইভাবে প্রথম গ্রেডে ৭৮ হাজার টাকা থেকে মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হলে প্রথম ধাপে বাড়তি অংশের ৪০ শতাংশ হিসেবে ৩১ হাজার ২০০ টাকা যুক্ত হবে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে ২৩ হাজার ৪০০ টাকা করে যোগ হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, মূল বেতন ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। তবে বিভিন্ন ভাতা একযোগে কার্যকর করার কথা রয়েছে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।
সরকারের ব্যয় বাড়বে
বর্তমানে দেশে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবী এবং প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগী রয়েছেন। চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ এ খাতে সরকারের মোট ব্যয় ১ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকার বেশি।
নতুন পে স্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় আরও বাড়বে। রাজস্ব আদায় দুর্বল থাকা, ব্যাংক খাতে চাপ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে এই বাড়তি ব্যয় সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
মূল্যস্ফীতি ও আয়বৈষম্য নিয়ে উদ্বেগ
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বড় ব্যবধানে বাড়ানো হলে সরকারি ও বেসরকারি খাতের আয়বৈষম্য আরও বাড়তে পারে।
তাদের মতে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়লে মানুষের হাতে অর্থের প্রবাহ বাড়বে। তবে একই সময়ে পণ্য ও সেবার সরবরাহ সমান হারে না বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের বেতন ক্ষয় পুষিয়ে দেওয়ার যৌক্তিকতা রয়েছে। তবে একই সঙ্গে বেসরকারি ও অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত বিপুলসংখ্যক মানুষের আয় যাতে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাড়ে, সে বিষয়েও নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন