জুলাই গণঅভ্যুত্থান, জুলাই-আগস্টের গণহত্যা এবং শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলের বিভিন্ন ঘটনা ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। জাতীয় সংসদে এ তথ্য জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ও জুলাই শহীদ জাবির ইব্রাহিমের মা রোকেয়া বেগমের লিখিত প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য জানান তিনি। শিক্ষামন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে তার পক্ষে প্রশ্নের উত্তর দেন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।
শিক্ষামন্ত্রী জানান, শিক্ষার্থীদের বয়স ও শ্রেণিভেদে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কারণ, ঘটনাপ্রবাহ, গণহত্যা, শহীদদের আত্মত্যাগ, নারীদের ভূমিকা এবং অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক তাৎপর্য পাঠ্যপুস্তকে তুলে ধরা হবে।
এ ছাড়া নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা’ পাঠ্যপুস্তকে শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলের বিভিন্ন ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে গুম, গণহত্যা, অর্থ পাচার, নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস, পিলখানা ট্র্যাজেডি, সাংবাদিক হত্যা ও গণমাধ্যমে হস্তক্ষেপের মতো বিষয় রয়েছে। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত হবে বলে জানান মন্ত্রী।
প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অফিস সহকারী দেওয়ার প্রস্তাব
রাজশাহী-৫ আসনের সরকারি দলের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অফিস সহকারী না থাকায় শিক্ষকদের ওপর দাপ্তরিক কাজের অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
এ কারণে প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একজন করে অফিস সহকারী দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৫) অনুমোদন হলে এ প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হবে।
শিক্ষার্থীদের মানসিক, নৈতিক ও সৃজনশীল বিকাশে দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়মিত ধর্মীয় শিক্ষা, চারুকলা ও সংগীত বিষয় চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
২০২৬-৩১ সালের মধ্যে সব মাদ্রাসায় মিড-ডে মিল
মৌলভীবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. শওকতুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, মাধ্যমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (এসইডিপি)-এর আওতায় ২০২৬ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে দেশের সব মাদ্রাসায় ‘মিড-ডে মিল’ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় এবতেদায়ী মাদ্রাসাও থাকবে।
নীলফামারী-৪ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিমের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, দেশে বর্তমানে এমপিওভুক্ত মাদ্রাসার সংখ্যা ৮ হাজার ২২৯টি। এর মধ্যে দাখিল মাদ্রাসা ৫ হাজার ৭৬৮টি, আলিম ১ হাজার ২৮৪টি, ফাজিল ৯৯৩টি এবং কামিল মাদ্রাসা ১৮৪টি।
আপাতত জাতীয়করণ হচ্ছে না বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের জামায়াতের সদস্য রফিকুল ইসলাম খানের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী জানান, দেশে নিবন্ধিত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১ হাজার ৮৭৩টি। এসব বিদ্যালয় আপাতত সরকারিকরণের কোনো পরিকল্পনা নেই।
কুড়িগ্রাম-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাহবুবুল আলম সম্পূরক প্রশ্নে জানতে চান, কম বেতনে কাজ করা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কথা বিবেচনা করে এসব বিদ্যালয় জাতীয়করণের উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না।
জবাবে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, এই মুহূর্তে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের বিষয়টি সরকারের আলোচনায় নেই।
তিনি জানান, কোথায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রয়োজন এবং কোন এলাকার শিশুরা প্রয়োজনীয় শিক্ষা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, তা চিহ্নিত করতে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব এলাকা চিহ্নিত হওয়ার পর সেখানে নতুন সরকারি বিদ্যালয় স্থাপন করা হবে, নাকি কোনো বেসরকারি বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হবে—সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার ১৬.২৫ শতাংশ
গাজীপুর-৪ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য সালাহ উদ্দিনের প্রশ্নের জবাবে জানানো হয়, বর্তমানে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশ।
ঝরে পড়া কমাতে ‘স্কুল ফিডিং’, উপবৃত্তিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি চালু রয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।
তিনি বলেন, দেশের ১৫০টি উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘স্কুল ফিডিং’ কর্মসূচি চলছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও ৩৪৯টি উপজেলায় ‘মিড-ডে মিল’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে স্কুল ইউনিফর্ম দেওয়ার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাগ, জুতা ও অন্যান্য শিক্ষা উপকরণ দেওয়ার উদ্যোগও রয়েছে।
চার বছর বয়স থেকেই প্রাক-প্রাথমিক কার্যক্রম
শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঁচ বছর বা তার বেশি বয়সী শিশুদের জন্য প্রাক-প্রাথমিক কার্যক্রম চলছে। পরীক্ষামূলকভাবে ৮ হাজার ২১৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চার বছর বা তার বেশি বয়সী শিশুদের জন্যও প্রাক-প্রাথমিক কার্যক্রম চালু করা হয়েছে।
সাতক্ষীরা-২ আসনের বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য মো. আব্দুল খালেকের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এবতেদায়ী মাদ্রাসা বর্তমানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেই। ভবিষ্যতে মন্ত্রিসভা বা সংসদ থেকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত এলে তখন বিষয়টি আলোচনা করা হবে।
নিবন্ধনের আওতায় আসছে সব কিন্ডারগার্টেন
নীলফামারী-৩ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ওবায়দুল্লাহ সালাফীর প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, দেশের সব কিন্ডারগার্টেন স্কুলকে নিবন্ধনের আওতায় আনার কার্যক্রম চলছে। অনলাইনে আবেদন গ্রহণ ও নিষ্পত্তির মাধ্যমে এ নিবন্ধন দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, চলতি বছরের জুলাই থেকে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৭৮৩টি কিন্ডারগার্টেন স্কুল নিবন্ধনের আওতায় এসেছে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন