বাংলা চলচ্চিত্রের ক্ষণজন্মা চিত্রনায়ক সালমান শাহ নেই ৩০ বছর। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মাত্র ২৪ বছর বয়সে তার মৃত্যুতে ঢাকাই চলচ্চিত্র অঙ্গনে তৈরি হয় বড় শূন্যতা। তিন দশক পেরিয়ে গেলেও অভিনয়, ফ্যাশন ও ব্যক্তিত্বের কারণে দর্শকের মনে এখনও অমলিন সালমান শাহ।
ওইদিন রাজধানীর ইস্কাটনের নিজ ফ্ল্যাট থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এরপর তার মৃত্যু নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা আলোচনা ও আইনি প্রক্রিয়া চলেছে।
মৃত্যুবার্ষিকীতে নানা আয়োজন
সালমান শাহর ৩০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) তিন দিনের উন্মুক্ত চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে। প্রতিদিন বিকেল ৪টায় ভিআইপি প্রজেকশন হলে দর্শকদের জন্য তার অভিনীত সিনেমা প্রদর্শিত হবে।
৬ থেকে ৮ সেপ্টেম্বর যথাক্রমে প্রদর্শিত হবে ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ও ‘তোমাকে চাই’।
এদিকে সালমান শাহকে স্মরণে সপ্তাহব্যাপী বিশেষ আয়োজন করেছে দীপ্ত টিভি। ৫ থেকে ১১ সেপ্টেম্বর প্রতিদিন দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে প্রচার করা হচ্ছে তার অভিনীত সাতটি জনপ্রিয় সিনেমা—‘বিচার হবে’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘এই ঘর এই সংসার’, ‘জীবন সংসার’, ‘প্রেম পিয়াসী’ ও ‘স্বপ্নের পৃথিবী’।
যেভাবে চলচ্চিত্রে সালমান শাহ
১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের জকিগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন সালমান শাহ। তার বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী ও মা নীলা চৌধুরী।
ছোটবেলা থেকেই সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সালমান। স্কুলজীবনে গান গাওয়ার পাশাপাশি ১৯৮৬ সালে ছায়ানট থেকে পল্লীগীতিতে প্রশিক্ষণ নেন। অভিনয়ে আসার আগে নাটকেও কাজ করেন তিনি।
মঈনুল আহসান সাবেরের লেখা ধারাবাহিক নাটক ‘পাথর সময়’-এ অভিনয়ের মাধ্যমে তার অভিনয়জীবনের সূচনা হয়। পরে আরও কয়েকটি নাটকে অভিনয় করেন তিনি।
চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমার মাধ্যমে। মৌসুমীর বিপরীতে অভিনয় করে রাতারাতি জনপ্রিয়তা পান সালমান শাহ। পরে শাবনূরের সঙ্গে তার জুটি ঢাকাই চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় জুটি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
জীবদ্দশায় সালমান শাহ অভিনীত সফল সিনেমাগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’, ‘তুমি আমার’, ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘সুজন সখি’, ‘বিক্ষোভ’, ‘প্রেম যুদ্ধ’, ‘কন্যাদান’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘আঞ্জুমান’, ‘মহামিলন’, ‘আশা ভালোবাসা’, ‘বিচার হবে’, ‘এই ঘর এই সংসার’, ‘প্রিয়জন’, ‘তোমাকে চাই’ ও ‘স্বপ্নের পৃথিবী’।
তার অভিনীত সর্বশেষ মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা ‘বুকের ভেতর আগুন’। এটি ১৯৯৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর মুক্তি পায়।
মৃত্যুর পরও জনপ্রিয়তা
সালমান শাহর মৃত্যুর পর মুক্তি পাওয়া ‘সত্যের মৃত্যু নেই’, ‘জীবন সংসার’, ‘মায়ের অধিকার’, ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’, ‘প্রেম পিয়াসী’, ‘স্বপ্নের নায়ক’, ‘শুধু তুমি’, ‘আনন্দ অশ্রু’ ও ‘বুকের ভেতর আগুন’ দর্শকদের কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়।
তার অকাল মৃত্যু চলচ্চিত্রাঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি করেছিল, তা এখনও পূরণ হয়নি বলে মনে করেন তার ভক্ত ও সহকর্মীদের অনেকে। সময়ের সঙ্গে প্রজন্ম বদলালেও সালমান শাহর জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে তার অভিনীত সিনেমা ও স্বতন্ত্র ফ্যাশন।
সালমান শাহর মৃত্যু নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহর মরদেহ উদ্ধারের পর তার বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী প্রথমে একটি অপমৃত্যু মামলা করেন। পরে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই তিনি এটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করেন।
আদালতের নির্দেশে সিআইডি তদন্ত করে ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। সেখানে সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়। ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে তার বাবা রিভিশন মামলা করলে ২০০৩ সালে বিষয়টি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠানো হয়।
২০১৪ সালে দেওয়া বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনেও হত্যার অভিযোগ নাকচ করা হয়। তবে সালমানের মা নীলা চৌধুরী ওই প্রতিবেদনে নারাজি দেন এবং তার ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় ১১ জনের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলেন।
পরবর্তীতে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় র্যাব। পরে আদালতের নির্দেশে তদন্তভার যায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিবিআই চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। প্রতিবেদনে ৫৪ জনের সাক্ষ্য ও জব্দ করা আলামত পর্যালোচনা করে হত্যার অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়।
পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে সালমান শাহর পারিবারিক কলহ ও মানসিক যন্ত্রণার বিষয়টি উল্লেখ করে আত্মহত্যার কথা বলা হয়। তবে তার মা এই প্রতিবেদনেও অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।
২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট পিবিআইয়ের প্রতিবেদন আমলে নিয়ে আসামিদের অব্যাহতি দেন। পরে সালমানের পরিবারের পক্ষ থেকে মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আবেদন করা হয়। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক ওই রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করেন।
সর্বশেষ, সালমান শাহ হত্যা মামলায় নাম থাকায় গত ৯ আগস্ট সৌদি আরব যাওয়ার সময় বিমানবন্দরে অভিনেতা আশরাফুল হক ডনকে ইমিগ্রেশন পুলিশ আটকে দেয়। পরে তাকে আদালতে পাঠায় সিআইডি। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ২০ আগস্ট তাকে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন। শুনানি শেষে ২৭ আগস্ট ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জুয়ের রানা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডনকে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
তিন দশক পরও সালমান শাহ শুধু একটি নাম নয়—বাংলা চলচ্চিত্রের একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়ের প্রতীক হয়ে আছেন। তার অভিনয়, পর্দার উপস্থিতি ও ফ্যাশন এখনও নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছে আগ্রহের বিষয়।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন