১০০ শয্যাবিশিষ্ট ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে চিকিৎসকের তীব্র সংকটের মধ্যেই চলছে চিকিৎসাসেবা। হাসপাতালটিতে অনুমোদিত ৬৬টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১৩ জন। ফলে ৫৩টি পদই শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে ২১টি বিষয়ের চিকিৎসক পদে কর্মরত নেই একজনও।
হাসপাতালে সহকারী সার্জনের ২০টি অনুমোদিত পদের একটিতেও কোনো চিকিৎসক নেই। গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় চিকিৎসা নিতে এসে ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগীরা। প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা না পেয়ে অনেককেই বরিশালসহ বিভিন্ন এলাকার হাসপাতালে যেতে হচ্ছে।
সরেজমিনে হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, বহির্বিভাগের প্রতিটি চিকিৎসকের কক্ষের সামনে রোগীদের দীর্ঘ সারি। চিকিৎসকের কক্ষে প্রবেশের জন্য অনেক রোগীকে আধা ঘণ্টা থেকে প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এ নিয়ে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে ক্ষোভও দেখা গেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রতিদিন বহির্বিভাগে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ এবং জরুরি বিভাগে ২৫০ থেকে ৩০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, ১৯৮৩ সালে ৫০ শয্যা নিয়ে ঝালকাঠি সদর হাসপাতালের যাত্রা শুরু হয়। ২০০৩ সালে এটি ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। ২০১৮ সাল থেকে হাসপাতালটিকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করার কাজ চলছে।
চিকিৎসক সংকট এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে চারজন চিকিৎসককে সহকারী সার্জন হিসেবে ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে পদায়ন করা হলেও এখন পর্যন্ত যোগ দিয়েছেন মাত্র একজন। বাকি তিনজন যোগদান করেননি। ফলে নতুন করে পদায়ন হলেও চিকিৎসক সংকটের তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি।
হাসপাতালের ৬৬টি চিকিৎসক পদের মধ্যে সিনিয়র কনসালট্যান্টের ১০টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র একজন। তিনি নাক, কান ও গলা (ইএনটি) বিভাগের চিকিৎসক। অর্থোপেডিক সার্জারি, সার্জারি, কার্ডিওলজি, চক্ষু, রেডিওলজি, অ্যানেসথেসিয়া, গাইনি, মেডিসিন ও শিশু বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্টের পদ শূন্য রয়েছে।
জুনিয়র কনসালট্যান্টের ১২টি পদের মধ্যে অর্থোপেডিক সার্জারি, সার্জারি ও অ্যানেসথেসিয়া বিভাগে একজন করে চিকিৎসক কর্মরত রয়েছেন। বাকি নয়টি পদ শূন্য। এসব শূন্য পদের মধ্যে রয়েছে কার্ডিওলজি, চক্ষু, রেডিওলজি, মেডিসিন, শিশু, ইএনটি, গাইনি, চর্ম ও যৌন বিভাগসহ একটি জুনিয়র কনসালট্যান্ট পদ।
এ ছাড়া সহকারী সার্জনের ২০টি পদের সবকটিই শূন্য। সহকারী সার্জন বা সমমানের আটটি পদের মধ্যে একজন কর্মরত এবং সাতটি পদ শূন্য। জরুরি বিভাগের আটটি মেডিকেল অফিসার পদের মধ্যে কর্মরত রয়েছেন দুজন, শূন্য ছয়টি। চারটি মেডিকেল অফিসার পদের মধ্যে কর্মরত তিনজন, শূন্য একটি।
আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তার একটি পদ, মেডিসিন বিশেষজ্ঞের একটি পদ ও তত্ত্বাবধায়কের একটি পদে একজন করে চিকিৎসক কর্মরত রয়েছেন। অন্যদিকে ডেন্টাল সার্জন ও ইউনানি চিকিৎসা কর্মকর্তার একটি করে পদ থাকলেও দুটিই শূন্য।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. টি এম মেহেদী হাসান বলেন, চিকিৎসক সংকটের কারণে প্রতিদিন তাকে ২০০ থেকে ২৫০ রোগী দেখতে হচ্ছে। এর পাশাপাশি প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জরুরি বিভাগেও দায়িত্ব পালন করতে হয়।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মাসুম ইফতেখার বলেন, সীমিত জনবল দিয়ে হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। চিকিৎসক সংকটের কারণে রোগীর চাপ বেশি হলে প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি তাকেও মাঝেমধ্যে রোগী দেখতে হয়। রোগীরা যাতে প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত না হন, সে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে হাসপাতালের কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
হাসপাতালে কার্ডিওলজি, চক্ষু, শিশু, গাইনি, রেডিওলজি, অ্যানেসথেসিয়া, সার্জারি ও অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ শূন্য রয়েছে। এসব বিভাগে প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা না থাকায় সংশ্লিষ্ট রোগীদের অনেক সময় অন্য হাসপাতালে যেতে হচ্ছে।
সদর উপজেলার নবগ্রাম ইউনিয়নের ইমাম হোসেন বলেন, হাসপাতালে প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না পেলে রোগীকে বরিশালে নিয়ে যেতে হয়। এতে চিকিৎসার খরচের পাশাপাশি যাতায়াত ও সময়—দুটিই বেড়ে যায়।
ঝালকাঠি পৌরসভার জেলেপাড়া রোডের বাসিন্দা কামাল সরদার বলেন, হৃদরোগ বা চোখের মতো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন হয়। সদর হাসপাতালে সেই চিকিৎসক না থাকলে রোগীকে অন্যত্র নিয়ে যেতে হয়।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ঝালকাঠি জেলা সম্পাদক ইসমাইল মুসাফির বলেন, ১০০ শয্যার একটি হাসপাতালে দিনের পর দিন বিপুলসংখ্যক চিকিৎসকের পদ শূন্য থাকা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মো. রেফায়েতুল হায়দার বলেন, বিভাগের সব উপজেলাতেই চিকিৎসক সংকট রয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। বিশেষ করে ঝালকাঠি জেলার পরিস্থিতির দিকে আলাদাভাবে নজর রাখা হচ্ছে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন