শুধু কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেই তাকে অপরাধী বানানো যাবে না। সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও আইনের বাইরে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
তিনি বলেন, কোনো কর্মকাণ্ডকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে ফৌজদারি ব্যবস্থা নিতে হলে আগে আইন করে সেটিকে ‘ক্রিমিনালাইজ’ করতে হবে।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
সাংবাদিকদের একটি অংশ শেখ হাসিনার মানবতাবিরোধী অপরাধের সহযোগী হিসেবে ভূমিকা রেখেছে—এমন প্রশ্নের জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, যাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে এবং সেই অপরাধের আওতায় নেওয়ার মতো তথ্য-প্রমাণ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার চলছে। কয়েকজন সাংবাদিক ইতোমধ্যে এ ধরনের মামলায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।
তবে শুধু শেখ হাসিনার পক্ষে কথা বলা বা তাঁকে সমর্থন করাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হলে এর জন্য সুনির্দিষ্ট আইন প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘কোনো কিছুকে ক্রিমিনালাইজ করার আগ পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে ক্রিমিনাল চার্জ আনা যায় না। আইন করে ক্রিমিনালাইজ করতে হবে।’
‘অন্যায়ের শিকার যেন কেউ না হন’
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে আইনের শাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করে উপদেষ্টা বলেন, শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগই ছিল সেখানে ন্যায়বিচার ছিল না এবং আইনের ভিত্তিতে কাজ করা হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে আইন থাকলেও তা পরিকল্পিতভাবে খারাপ আইন হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
বর্তমান সরকার কিংবা ভবিষ্যতের কোনো গণতান্ত্রিক সরকারের অধীনে কেউ যেন অন্যায়ের শিকার না হন, সেটি নিশ্চিত করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে গোপন বৈঠক বা ষড়যন্ত্রের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, কোনো গোপন বৈঠক হয়েছে কি না, সেটি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দেখার বিষয়। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যাহত হতে পারে—এমন কোনো তৎপরতা হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রসঙ্গে
সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের ঘটনায় আলাদা ‘সাংবাদিক সুরক্ষা আইন’ করার দাবি নিয়েও কথা বলেন তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলা বা নির্যাতনের ঘটনায় প্রচলিত আইনেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। নতুন আইন করা যেতে পারে, তবে শুধু নতুন আইন করলেই সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
যেসব ঘটনায় সাংবাদিকদের ওপর হামলা হয়েছে, বিদ্যমান আইনেই সেসব ঘটনার বিচার অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তদন্ত শেষের আগে সাংস্কৃতিক কর্মীদের নাম নয়
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাংস্কৃতিক কর্মীদের নাম অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে জাহেদ উর রহমান গণমাধ্যমকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, তদন্ত চলাকালে কারও নাম নিয়ে অনুমাননির্ভর আলোচনা করা উচিত নয়। প্রধান প্রসিকিউটর কোনো সাংস্কৃতিক কর্মীর সম্পৃক্ততার প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ বা চার্জ না হওয়া পর্যন্ত কারও নাম প্রকাশ করা ঠিক হবে না।
‘সেনসেশনালিজমের জন্য যে কারও একটা নাম বলে ফেলা উচিত নয়’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তদন্তের মাধ্যমে তা যাচাই করতে হবে। আনুষ্ঠানিকভাবে চার্জ গঠন করা হলে গণমাধ্যম তখন বিষয়টি জানতে পারবে।
জে-১০ কেনার পেছনে ‘খরচের হিসাব’
চীন থেকে জে-১০ যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা নিয়েও সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেন জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, আধুনিক মাল্টিরোল ফাইটার কেনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও চীনের বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনা করা হয়েছে। সবকিছু হিসাব-নিকাশ করে চীনের বিকল্পটি বাংলাদেশের জন্য তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক মনে হয়েছে।
তিনি বলেন, একই ধরনের সক্ষমতার যুদ্ধবিমান তুলনামূলকভাবে অনেক কম খরচে কেনা সম্ভব। হিসাব করলে খরচ অর্ধেকেরও কম, প্রায় এক-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি হতে পারে।
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বর্তমান সক্ষমতার কথা তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, দেশের সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলোর মধ্যে থাকা মিগ-২৯ এখন খুব অল্পসংখ্যক। সেগুলোও পুরোপুরি কার্যকর নয়। অন্যদিকে এফ-৭ যুদ্ধবিমানগুলো অনেক পুরোনো।
আধুনিক মাল্টিরোল ফাইটার কেনার বিষয়টি ‘ফোর্সেস গোল’-এর মধ্যেই রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, হঠাৎ করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। এটি দীর্ঘমেয়াদি ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অংশ।
তবে যুদ্ধবিমান কেনাকাটায় দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে সরকার সতর্ক থাকবে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, অতীতে মিগ-২৯ কেনার সময় দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল, মামলা ও নানা ঘটনাও ঘটেছিল। এবার সরকার এসব বিষয়ে সতর্ক থাকবে।
বোয়িং নিয়ে সরকারের ঘোষণা নেই
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে বোয়িং কেনার চুক্তি হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, সরকার এখনো এ বিষয়ে কিছু জানায়নি। তাই সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে মন্তব্য করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, যদি কোনো চুক্তি হয়ে থাকে, সরকারই তা জানাবে। এ ধরনের চুক্তি গোপন রাখার কোনো বিষয় নয়। সরকার চুক্তি করলে তা অবশ্যই প্রকাশ করবে।
প্রতি লিটার তেলে ভিটামিন ডি, বাড়তি খরচ ৬৭ পয়সা
প্রেস ব্রিফিংয়ে জনস্বাস্থ্যের একটি উদ্যোগের কথাও জানান জাহেদ উর রহমান। ভোজ্যতেলে ভিটামিন ডি যুক্ত করার প্রস্তাবকে তিনি ‘চমৎকার আইডিয়া’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি জানান, গবেষণায় কক্সবাজারের জেলেদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যকের শরীরে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি পাওয়ার তথ্য তাঁকে জানানো হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয়, তাঁরা দীর্ঘ সময় সূর্যের আলোতে কাজ করেন।
উপদেষ্টা বলেন, প্রতি লিটার ভোজ্যতেলে ভিটামিন ডি যুক্ত করতে আনুমানিক ৬৭ পয়সা অতিরিক্ত খরচ হতে পারে। এ জন্য প্যাকেজিংয়েও কিছু পরিবর্তন প্রয়োজন হবে। বিষয়টি দ্রুত বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ভোজ্যতেলে ভিটামিন এ এবং লবণে আয়োডিন ফোর্টিফিকেশন করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর ফলে ভিটামিন এ ও আয়োডিনের ঘাটতি মোকাবিলায় সুফল পাওয়া গেছে। একইভাবে ভিটামিন ডি ফোর্টিফিকেশন করা গেলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন