জীবনের প্রায় পুরোটা সময় কেটেছে বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে। সকাল হলেই স্কুলে আসতেন, শিশুদের নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। স্কুল ছুটির পরও শিশুদের সঙ্গেই কাটত তার সময়। শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি ছিলেন মায়ের মতো। সেই প্রিয় প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভীনের (৫৭) মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো বিদ্যালয়ে।
রোববার সকালে শিক্ষার্থীরা প্রতিদিনের মতো স্কুলে এলেও প্রিয় রনজিলা পারভীন ম্যাডামকে আর কক্ষে দেখতে পায়নি। দুপুরে স্কুল মাঠে পৌঁছায় একটি লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স। তাতে নিথর হয়ে শুয়ে ছিলেন তাদের প্রিয় শিক্ষক।
ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা কাঁদতে কাঁদতে অ্যাম্বুলেন্সের কাচের ফাঁক দিয়ে শেষবারের মতো প্রিয় ম্যাডামের মুখ দেখছিল। সহকর্মী, অভিভাবক ও সাবেক শিক্ষার্থীরাও তাকে শেষ বিদায় জানাতে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হন। এ সময় সবাই তার সঙ্গে কাটানো নানা স্মৃতি স্মরণ করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
চোখের চিকিৎসার জন্য শনিবার ভোরে স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় গিয়েছিলেন রনজিলা পারভীন। রিকশায় করে হাসপাতালে যাওয়ার পথে রাজধানীর সংসদ ভবন এলাকায় ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন তিনি। মোটরসাইকেলে থাকা দুই ছিনতাইকারী তার হাতে থাকা ব্যাগ টান দিলে তিনি রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান।
পরে তাকে দ্রুত শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
রনজিলা পারভীন বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী সরকারি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। বিদ্যালয়টি সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বাড়ি থেকে প্রায় ৫০০ গজ দূরে। তার বাড়ি উপজেলার সোনাকানিয়া গ্রামে। তবে তিনি স্বামী-সন্তান নিয়ে বগুড়া শহরের রহমাননগর এলাকায় বসবাস করতেন এবং সেখান থেকে নিয়মিত স্কুলে যাতায়াত করতেন।
১৯৮৮ সালের জানুয়ারিতে সহকারী শিক্ষক হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন রনজিলা পারভীন। পরে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি পেয়ে বাগবাড়ী সরকারি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগ দেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
রনজিলা পারভীনের স্বামী আব্দুল মতিন বগুড়া নিউ মার্কেটের কাপড় ব্যবসায়ী। তাদের একমাত্র মেয়ে রাইশা বগুড়া ইয়াকুবিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
ঢাকায় ময়নাতদন্ত শেষে শনিবার রাত ২টার দিকে রনজিলা পারভীনের মরদেহ বগুড়ায় পৌঁছে। রোববার দুপুর ২টায় বাগবাড়ী সরকারি বালিকা বিদ্যালয় মাঠে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
পরে গাবতলীর দাড়াইল গ্রামে স্বামীর বাড়ির পারিবারিক গোরস্তানে বিকেল সোয়া ৩টার দিকে তাকে দাফন করা হয় বলে জানান রনজিলার বড় ভাই জাহিদুল ইসলাম।
প্রিয় শিক্ষককে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ তার শিক্ষার্থী, সহকর্মী, অভিভাবক ও স্বজনরা। যে মানুষটি সারাজীবন শিশুদের শিক্ষা ও স্নেহ দিয়ে গেছেন, শেষ বিদায়ে সেই শিশুরাই চোখের জলে তাকে বিদায় জানাল।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন